একসময় ভোরের ঘুম ভাঙাত যে ডাক, আর নগরজীবনের উচ্ছিষ্ট নিঃশব্দে সরিয়ে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে যে পাখিরা নিরলস ভূমিকা রাখত–সেই কাকের সংখ্যাই নীরবে কমে আসছে ঢাকায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাতি কাক ও আকারে বড় দাঁড়কাক ছিল রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভোরের আকাশ, গাছের ডাল, ছাদের কার্নিশ কিংবা ব্যস্ত বাজার—সবখানেই ছিল তাদের অবাধ বিচরণ। ঘন সবুজের ছায়ায় শত শত কাক বাসা বাঁধত; মানুষের ফেলে যাওয়া খাদ্য ও জৈব বর্জ্য খেয়ে তারা নগরের এক নিরলস পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ভূমিকা পালন করত।
কিন্তু সেই চেনা দৃশ্য এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতো একসময় কাকের কোলাহলে মুখর এলাকাগুলোতেও সন্ধ্যায় দলবদ্ধ কাকের ডাক ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কাকের বিশাল ঝাঁকের বদলে এখন সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অল্প কিছু কাকের দেখা মেলে। কাকের এই নিরবে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো, লাগামহীন নগরায়ণ।

উঁচু ভবন, সড়ক ও উড়াল এক্সপ্রেসওয়ের বিস্তারের জন্য একের পর এক কেটে ফেলা হচ্ছে পরিণত বয়সের বট, নিম, রেইনট্রি ও অন্যান্য বড় গাছ। হারিয়ে যাচ্ছে কাকের নিরাপদ বাসা বাঁধার স্থান, বিশ্রামের আশ্রয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত আবাসস্থল। একসময়ের সবুজ, ছায়াঘেরা সড়কের জায়গা দখল করছে কাচ ও কংক্রিটের উঁচু দেয়াল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জটিল বৈদ্যুতিক তার, উচ্চ ভোল্টেজের লাইন এবং ক্রমবর্ধমান মোবাইল টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো। ফলে ঢাকার আকাশও অনেক পাখির জন্য হয়ে উঠছে এক বিপজ্জনক গোলকধাঁধা—যেখানে দিক হারিয়ে সংঘর্ষে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
কাকের সংকট শুধু আশ্রয় হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আঘাত এসেছে তাদের খাদ্য সংস্থানেও। অভিযোজন ক্ষমতার জন্য খ্যাত কাক ময়লার স্তূপ, ডাস্টবিন, নদীর তীর কিংবা কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত খোলা বাজার থেকে খাবার সংগ্রহ করে সহজেই টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সেই বর্জ্যই এখন তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক, রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যবর্জ্য, কীটনাশক ও ইঁদুর মারার বিষসহ নানা দূষিত পদার্থ খাবারের সঙ্গে তাদের শরীরে যাচ্ছে। ফলে বিষক্রিয়া ও দূষণের কারণে এই পাখির মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।

কখনো কখনো কংক্রিটের ফুটপাত বা রাস্তার পাশে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ছাড়াই পড়ে থাকতে দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্ক কাকের নিথর দেহ। এমন মৃত্যু আমাদের দৃষ্টি ফেরায় শহরের অদৃশ্য দূষণের দিকে—বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার মতো দীর্ঘদিন ধরে দূষণ ও অবক্ষয়ের শিকার জলপথগুলোর দিকে। পানি, মাটি, বর্জ্য ও খাদ্যশৃঙ্খলের এই সম্মিলিত দূষণ কেবল মানুষের জন্য নয়, নগরের সঙ্গে সহাবস্থানকারী প্রাণীদের জন্যও ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া তাই নিছক একটি পাখির হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর পরিবেশগত অভিঘাত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটে থাকা একটি মেগাসিটির জন্য কাক এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তারা পচনশীল জৈব বর্জ্য, মৃত ইঁদুর এবং বাজারের পশু জবাইয়ের উচ্ছিষ্ট খেয়ে ফেলে। এভাবে অনেক বর্জ্য ও মৃত প্রাণী দ্রুত অপসারিত হয় এবং রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কিছুটা কমে।
তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় নগরের খাদ্যশৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, এর ফলে আবর্জনা জমে থাকা, পোকামাকড় ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর বিস্তার এবং রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অর্থাৎ, কাকের এই নীরব বিলুপ্ত আসলে শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি দৃশ্যমান সংকেত।

এখনও সময় আছে। নগর পরিকল্পনায় সবুজ করিডোরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে পরিণত ও ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোকে। পাশাপাশি কমাতে হবে বর্জ্য ও পানি দূষণ, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বিষাক্ত রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং পাখিদের নিরাপদ চলাচলের জন্য তৈরি করতে হবে আরও প্রাণীবান্ধব নগর অবকাঠামো।
কারণ কাক কেবল আমাদের পরিচিত একটি পাখি নয়। কাকের ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া ডাক, শুধু একটি পরিচিত পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি একটি স্পষ্ট পরিবেশগত সতর্কবার্তা। যা স্পষ্ট করে যে, এই শহর মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করেই টিকে থাকার জন্য নিজেদের গড়ে তোলা প্রাণীদের জন্যও ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
যে শহর কংক্রিট, কাচ আর উঁচু ভবনের উচ্চতায় তার অগ্রগতি খুঁজে ফেরে, সেখানে ধীরে ধীরে কাকের হারিয়ে যাওয়া ডাক আমাদের মনে করিয়ে দেয়–শহর যতই উঁচু হোক, প্রকৃতিকে হারিয়ে কোনো নগর সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হতে পারে না। কারণ কিছু ক্ষতি কখনোই ইট-পাথরে গড়া ইমারত দিয়ে পূরণ করা যায় না।


