একটি করে ইটের আড়ালে হারাতে থাকা কৃষিজমি

একটি করে ইটের আড়ালে হারাতে থাকা কৃষিজমি
সাতকানিয়ায় কৃষিজমিতে ইটভাটা। ছবি: জাকির হোসেইন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

একসময় সাতকানিয়া দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে যাওয়ার সময় দুই পাশে দেখা যেত বিস্তীর্ণ কৃষিজমি—কোথাও ধান, কোথাও মরিচ, আবার কোথাও আলু। দূরে সবুজ পাহাড়ের সারি সেই দৃশ্যকে আরও মনোরম করে তুলত। এখন সেই চেনা দৃশ্য বদলে গেছে অনেকটাই।

মহাসড়কের দুই পাশে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ইটভাটা। কোথাও একসময়ের ফসলি জমির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ভাটার চিমনি, আবার কোথাও মাটি কেটে তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত।

অনেক ইটভাটার কাজই শুরু হয় কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটে নেওয়ার মাধ্যমে। পরে সেই মাটি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে কয়েক দফা মাটি কাটার পর জমির অনেক অংশ নিচু হয়ে যায়। তৈরি হয় গভীর খাদ, যা জমিতে চাষাবাদকে ক্রমেই কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব করে তোলে।

ছবি: জাকির হোসেইন/টাইমস

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়া উপজেলায় বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ৭৪টি ইটভাটা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ইটভাটার পাশাপাশি মাটি ব্যবসায়ীরাও কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে নিচ্ছেন। অনেক কৃষক প্রতিবাদ করতে চান না, কারণ তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ড প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে।

কালিয়াইশ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক আবদুল কাদের জানান, একসময় তিনি প্রায় ১০০ শতক জমিতে মরিচ ও আলু চাষ করতেন। এখন সেখানে সরিষা ও দেশি জাতের শিম চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘ইটভাটার ধোঁয়ায় আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মরিচগাছের পাতা ঝরে পড়ে, আর আলুও ঠিকমতো হয় না। শুধু কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।’

আরও পড়ুন

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে উপজেলায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ইটভাটার ধোঁয়া এবং কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটিকাটা–দুটিই কৃষির ক্ষতি করছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।’

ছবি: জাকির হোসেইন/টাইমস

সমস্যাটি শুধু সাতকানিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে পটিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলাতেও ইটভাটার বিস্তার ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কৃষিজমি ক্রমাগত কমে যাওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ইটভাটায় কাঠ পরিবহন ও পোড়ানো বন্ধে নজরদারি চলছে। আপাতত পাহাড় কাটা বন্ধ রয়েছে। তবে শীত মৌসুমে এটি আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

যেসব জমিতে একসময় ফসল ফলত, সেসব জমিতেই এখন তৈরি হচ্ছে ইট। কৃষকদের জীবিকার অন্যতম ভিত্তি যে মাটি, সেটিই এখন ইটভাটার প্রধান কাঁচামালে পরিণত হয়েছে।

সাতকানিয়ার মহাসড়কঘেঁষা এলাকার এই পরিবর্তন তাই শুধু দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার গল্প নয়। এটি একটি করে ইটের আড়ালে ক্রমে কৃষিজমি হারিয়ে যাওয়ারও এক নির্মম চিত্র।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর