রাজধানী ঢাকার বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির এলাকার গৃহিণী তানবীন সুলতানা শহরের ধুলোবালি ও গাড়ির ধোঁয়া থেকে বাঁচতে বছরের পর বছর পারতপক্ষে ঘরের বাইরে যেতেন না। দূষিত বাতাস থেকে মুক্ত থাকতে সারাক্ষণ পরিষ্কার ঘরবাড়ি। কিন্তু তিনি টের পাননি, আসল বিপদ ততদিনে ঘরের ভেতরেই জমতে শুরু করেছে।
হঠাৎ করেই তানবীনের শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেয়। আগে কখনো অ্যালার্জির সমস্যা না থাকলেও চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিন ঘরের ভেতরের দূষিত বাতাস ও ধূলিকণার মধ্যে থাকার কারণেই তার এই অবস্থা হয়েছে। তানবীন আফসোস করে বলেন, ঘর এত পরিষ্কার রাখার পরও তিনি ধুলোবালি থেকে রেহাই পাননি।
তার এই ঘটনা তুলে ধরে রাজধানীতে বসবাসের এক ভয়াবহ বাস্তবতা। ঘরের ভেতরের বাতাস বাইরের চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়, বরং ক্ষেত্রভেদে আরও বেশি বিপজ্জনক। বায়ুদূষণ বলতেই সাধারণত রাস্তার কালো ধোঁয়া, কারখানার নির্গমন বা নির্মাণকাজের ধুলোকে বোঝানো হয়। ঘরের ভেতরের বাতাস যে দূষিত হতে পারে, সেদিকে কারও নজর থাকে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলো-বাতাস চলাচলের অভাব, ঘরের ভুল নকশা এবং মানুষের কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণেই ঘরের ভেতর দূষণের আস্তানা হয়ে উঠছে।
৭ সেপ্টেম্বর সোমবার ‘আন্তর্জাতিক নির্মল বাতাস ও নীল আকাশ দিবস’-এর আগে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ইনডোর এনভায়রনমেন্টস’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকার এই পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে করা এই গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বাড়িগুলোর ভেতরের বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
ঢাকার ৪৩টি বাড়িতে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে এই ক্ষতিকর কণার গড় পরিমাণ ৭৫ দশমিক ৬৯ মাইক্রোগ্রাম, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২৪ ঘণ্টায় এটি ১৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। কোনো কোনো বাড়িতে এই মাত্রা প্রায় ২৯৬ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
গবেষক সাখাওয়াত হোসেন জানান, ঘরের ভেতরের এই দূষণের পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ কাজ করে। প্রথমত, দরজা, জানালা ও ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরের খারাপ বাতাস ভেতরে ঢুকে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৪০ শতাংশ দূষণ ঘটায়। দ্বিতীয়ত, রান্নাঘরের ধোঁয়া থেকে আসে ১১ শতাংশ দূষণ। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে রান্না করলে ঘরের বাতাস দ্রুত দূষিত হয় এবং রান্নার সময় বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ ১৮১ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত উঠে যায়। তৃতীয়ত, ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের চেয়ে বড় বাড়িতে বাইরের বাতাস বেশি ঢোকার সুযোগ পায় বলে সেখানে দূষণের মাত্রা ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। আর বাকি অংশটি ঘটে অন্যান্য দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের কারণে।
রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জেডএইচএম মনজুর মোর্শেদ বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ রান্নাঘরের নকশাতেই গণ্ডগোল থাকে। সঠিক আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ না রাখায় ছোট ছোট রান্নাঘরগুলো আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। রান্নাঘরে মুখোমুখি জানালা, উঁচু স্থানে ফোকর ও চিমনি থাকলে ধোঁয়া ও গরম বাতাস সহজেই বের হয়ে যেতে পারে।
পাশাপাশি মানুষের কিছু অভ্যাসও দূষণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন, শুকনো ঝাড়ু দিলে মেঝেতে জমে থাকা ধুলো আবার বাতাসে উড়তে শুরু করে। বন্ধ ঘরে মশার স্প্রে দিলে ক্ষতিকর রাসায়নিক বাতাসে আটকে থাকে। গবেষকরা তাই ঝাড়ু দেওয়ার বদলে ভেজা কাপড় দিয়ে ঘর মোছার পরামর্শ দিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি বাড়িতে দিনে আট ঘণ্টারও বেশি সময় জানালা খোলা রাখা হয়, যা বাইরের দূষিত বাতাসকে অবিরত ভেতরে আসতে দেয়। এ ছাড়া যেসব ঘরে ধূমপান করা হয়, সেখানকার বাতাস আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
অনলাইনে খাবার বিক্রি করা ৩৭ বছর বয়সী রিদি খাতুনের অভিজ্ঞতাও একই। প্রতিদিন রান্নাঘরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাটাতে গিয়ে তিনিও এখন শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে ধোঁয়া বের হওয়ার ভালো ব্যবস্থা নেই। অনেকের রান্নাঘরে এক্সজস্ট ফ্যান থাকলেও তা ঠিকমতো কাজ করে না।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির মোহাম্মদ তানভীর ইসলাম জানান, রান্নার ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা কেবল রান্নাঘরে আটকে থাকে না। অপরিসর বাড়িতে তা শোবার ঘরসহ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিবারের ছোট-বড় সবার জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে গবেষকরা বাইরে দূষণ বেশি থাকলে ঘরের জানালা বন্ধ রাখা, ঘরে মশার কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার না করা এবং সম্ভব হলে বাতাস শোধনের জন্য ‘এইচইপিএ’ ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে বায়ু ও শব্দদূষণ বিশেষজ্ঞ আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, এয়ার পিউরিফায়ার দামি হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের কাজে আসবে না। তার মতে, পিউরিফায়ার কিনে সমাধান হবে না, দূষণের মূল উৎসগুলো বন্ধ করাই একমাত্র কাজ।
গ্রামাঞ্চলেও এই সমস্যা বেশ প্রকট। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাঠ, গোবর ও কয়লা পুড়িয়ে রান্না করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গর্ভবতী নারী ও শিশুরা। এটি শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি ও শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহারে অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক জানান, গ্রামাঞ্চলে সৌরচালিত চুলা, এলপিজি বা এলএনজি গ্যাস পৌঁছাতে পারলে এই দূষণ কমানো সম্ভব। এ নিয়ে ২০২৮ সালের দিকে একটি প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, বাংলাদেশে বাইরের বায়ুদূষণ নিয়ে কথা হলেও ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা তদারকি নেই।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নিয়মিত পরিষ্কার না করা এয়ার কন্ডিশনারও (এসি) ঘরের ভেতর ক্ষতিকর ধূলিকণা ছড়িয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।


