ইসলামবাগ এসটিএসের পাশের ভাঙাড়ির দোকানে কম্পিউটারের মাদারবোর্ড থেকে সীসা আলাদা করছিল ১৩ বছর বয়সী আল আমিন। দুই বছর ধরে সে এখানে কাজ করছে।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কামরাঙ্গীচরে থাকলেও দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে এই ভাঙাড়ির দোকানে। হাতে কোনো গ্লাভস নেই, নেই মাস্ক বা অন্য কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম।
আল আমিন জানায়, ব্যাটারি, চার্জার, টর্চলাইট, মোবাইল ও ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে প্লাস্টিক আলাদা করে মূল্যবান ধাতু বের করাই তার কাজ। প্রতিদিন ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে সে।
দোকান মালিক রবিউল ইসলাম জানান, এসটিএস থেকে কেজি দরে ই-বর্জ্য কিনে এনে এখানে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেন। এসটিএসেও একই চিত্র দেখা যায়, কর্মীরা কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই বর্জ্যের স্তূপ থেকে মূল্যবান উপাদান আলাদা করছেন।
আল আমিনের মতো হাজারো শ্রমিকের হাত ধরেই দেশে ই-বর্জ্যের বড় একটি অংশ পুনর্ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা এই ই-বর্জ্য নিরাপদ ও পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
২০২১ সালে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা জারি হলেও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহির অভাবে অধিকাংশ ই-বর্জ্য এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতের হাতেই চলে যাচ্ছে। ফলে বিষাক্ত ধাতু ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে প্রতিদিন ঝুঁকিতে পড়ছে আল আমিনের মতো শিশু শ্রমিক, আর পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়ছে নীরব দূষণ।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো বড় ধরনের অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশে বছরে ঠিক কত ই-বর্জ্য উৎপন্ন ও পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার নেই। বিভিন্ন গবেষণায়ও ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২১ সালে দেশে ১৭০ মিলিয়ন কেজি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার তথ্য দিয়েছে।
গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪-এর হিসাবে ২০২২ সালে এ পরিমাণ ছিল ৩৫ কোটি কেজি, যা ২০৫০ সালে ১০ বিলিয়ন কেজি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় ২০১৭ সালে ৩১ কোটি কেজি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার তথ্য দিয়ে ২০৩৫ সালে তা ৪৬২ কোটি কেজিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দেশে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। মোট ই-বর্জ্যের মাত্র ৩ শতাংশ সরকার অনুমোদিত আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার হয়। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণা অনুযায়ী, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের প্রকাশিত গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপাদনের হার নথিভুক্ত পুনর্ব্যবহারের তুলনায় পাঁচ গুণ দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালে বিশ্বে রেকর্ড ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে, যা ২০১০ সালের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ বেড়ে ৮ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন বা বিধিমালা প্রণয়ন করলেই কার্যকর ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না। উৎপাদক, আমদানিকারক, সংগ্রহকারী, রিসাইক্লার, পরিবহনকারী, মেরামতকারী ও ভোক্তাদের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন, তথ্য আদান-প্রদান, তদারকি এবং জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সমন্বিত কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো তৈরি হয় ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’ প্রণয়নের মাধ্যমে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর আওতায় ২০২১ সালের ১০ জুন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ বিধিমালা জারি করে।
বিধিমালা অনুযায়ী উৎপাদকদের নিবন্ধন এবং ধাপে ধাপে ই-বর্জ্য সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামসহ ১১টি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে।
বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। একই অপরাধ পুনরাবৃত্তি হলে দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
তবে উৎপাদকদের প্রথম বছরে ১০ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ই-বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার না থাকায় সেই অগ্রগতি মূল্যায়নের সুযোগ নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) আব্দুল্লাহ আল মামুন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে জনবল বৃদ্ধি, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধভাবে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।’
বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আইন থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয়। এই খাতে শ্রমিকরা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়াই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ভাঙা, পোড়ানো এবং রাসায়নিক ব্যবহার করে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করেন।
বাংলাদেশ ই-ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা আখতার-উল-আলম বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতে কম খরচে কাজ হওয়ায় তারা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়। কিন্তু প্লাস্টিক পোড়ানো, ব্যাটারি ভাঙা বা অ্যাসিড ব্যবহারের মতো পদ্ধতিতে সীসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তার মতে উৎপাদক, আমদানিকারক, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিটিআরসি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর শাসন কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে বাদ না দিয়ে তাদেরকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনার পক্ষে মত দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ‘অনেক রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ই-বর্জ্য সংগ্রহেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু ভাঙারি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সংগ্রাহকদেরও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে ই-বর্জ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়বে এবং পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহারও নিশ্চিত হবে।’
দেশে সরকার অনুমোদিত রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। জেএসএম রিসাইক্লিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
তার ভাষ্য, দেশে অনুমোদিত ১০ থেকে ১২টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও উৎপন্ন ই-বর্জ্যের ৯০ শতাংশের বেশি এখনও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত মান বজায় রেখে কাজ করতে হয় এবং নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে কোনো জবাবদিহি না থাকায় পরিচালন ব্যয় কম হয় এবং অধিকাংশ ভাঙারি ব্যবসায়ী সেই চ্যানেলকেই বেছে নেন। তাই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং উৎপাদকদের সংগৃহীত ই-বর্জ্য নিবন্ধিত রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। নিবন্ধিত রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাদের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তিনি জানান, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক্সটেনডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কার্যকর করার বিষয়ে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।


