কারাবন্দীদের টার্গেট করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকচক্র

কারাবন্দীদের টার্গেট করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকচক্র
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

কারাগারে থাকা স্বজনকে মুক্ত করা, জামিন করানো, রিমান্ড ঠেকানো কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলে বন্দীদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকচক্র। কখনো বন্দী অসুস্থ, কখনো কারাগারে মারামারি করে বিপদে পড়েছেন, আবার কখনো তাকে অন্য কারাগারে পাঠানো হবে—এমন নানা কথা বলে পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন কারাবন্দীদের বেশ কয়েকজন স্বজন। প্রতারকরা নিজেদের কখনো পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো কারা কর্মকর্তা, আবার কখনো আদালতের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দেন। বন্দীদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস অর্জন করেন তারা। এরপর নানা অজুহাতে টাকা দাবি করেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মো. সোনারউদ্দিন দীর্ঘ ১৭ বছর কারাগারে থাকার পর যখন মুক্তি পান, তখন দেখেন তার পরিবারের সঞ্চয় বলতে প্রায় কিছুই নেই। একটি হত্যা মামলায় সোনারউদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে ১৪ বছর পর সুপ্রিম কোর্ট তাকে খালাস দেয়। কিন্তু মামলা চালাতে গিয়ে তার পরিবারকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। এর মধ্যে প্রতারকদেরও টাকা দিয়েছেন তারা।

সোনারউদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশ-কে বলেন, ‘আমি কারাগারে যাওয়ার পর আমার মা-বাবা মারা যান। পরে আমি উত্তরাধিকার সূত্রে তিন বিঘা জমি পাই। সেই জমি থেকে পাওয়া টাকাও আইনজীবীদের পেছনে খরচ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি প্রতারকদের হাতেও অনেক টাকা হারিয়েছি।’

সোনারউদ্দিন আট বছর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। এরপর তাকে কেরানীগঞ্জের হাই সিকিউরিটি কারাগারে রাখা হয়। সেখানে থাকার সময় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তার পরিবারের সদস্যদের বারবার ফোন করতেন। কখনো জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা, কখনো মামলা থেকে খালাস পাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা, আবার কখনো আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলে টাকা চাইতেন সেসব মানুষ।

সোনারউদ্দিন তার স্ত্রীর কাছ থেকে শোনা একটি ঘটনার কথা জানিয়ে বলেন, ‘এক ব্যক্তি ফোন করে বলেছিলেন, তিনি একজন ব্যারিস্টারের হয়ে কাজ করেন। তিনি আমাকে কারাগার থেকে বের করে দিতে পারবেন জানিয়ে আগাম ৫০ হাজার টাকা চান। আমার স্ত্রী তাকে টাকা দেওয়ার পর ওই ব্যক্তি আর কোনো যোগাযোগ করেননি।’

একই হত্যা মামলার আরেক আসামি ইসমাইল হোসেনও পরে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তার স্বজনরাও মামলা চালাতে গিয়ে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন। তারা আইনি খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করেন। এর মধ্যেই প্রতারকদের হাতেও টাকা হারান। বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে আছেন ইসমাইল।

কারাবন্দীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এমন প্রতারণার ঘটনা এখন দিন দিন বাড়ছে। প্রতারকরা নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখান। কখনো বলা হয়, বন্দী কারাগারে বিপদে পড়েছেন। কখনো বলা হয়, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার কখনো বলা হয় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে বা অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হবে।

এ ছাড়া টাকা দিলে কারাগারের ভেতরে বন্দীকে ভালো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়। এসব কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয় প্রতারক চক্র।

কারাবন্দীদের কয়েকজন স্বজন এবং সাবেক কয়েকজন বন্দী টাইমসকে জানান, তারা এ ধরনের প্রতারণার চেষ্টা বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

কাশিমপুর-১ ও কাশিমপুর-২ কারাগারে থাকা বন্দীদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, প্রতারকরা প্রায়ই নিজেদের পুলিশ কর্মকর্তা, কারা কর্মকর্তা কিংবা আদালতের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দেন।
বন্দীর নাম, কোন কারাগারে আছেন, তার মামলার ধরনসহ বিভিন্ন সঠিক তথ্য প্রতারকদের কাছে থাকে। এসব তথ্য ব্যবহার করে তারা পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করান যে তারা সত্যিই সরকারি কর্মকর্তা। এরপর বন্দীর বিপদের কথা বলে পরিবারের সদস্যদের আতঙ্কিত করে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলা হয়।

ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) কর্নেল মোস্তফা কামালও এ ধরনের ঘটনার কথা স্বীকার করেন।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটে। অপরাধী চক্র বিভিন্ন উপায়ে বন্দীদের তথ্য সংগ্রহ করে। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা করে।’

তিনি জানান, প্রতারকরা কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজন্স) নাম ও পরিচয়ও ব্যবহার করেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কারা কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আরও পড়ুন

এ ধরনের প্রতারণা থেকে বন্দীদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে কারা কর্তৃপক্ষ সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে একটি ভিডিও তৈরি করে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করা হচ্ছে।

তবে প্রতারণার শিকার কয়েকজনের সন্দেহ, কারাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি এসব ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। কারণ বন্দীদের ব্যক্তিগত তথ্য সাধারণত কারা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। অনেক সময় বন্দীরা কারাগার থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্বজনদের ফোন নম্বর দেন। পরে এসব ফোন নম্বরই প্রতারকরা ব্যবহার করে।

প্রতারকরা সাধারণত রাতে কিংবা ভোরে ফোন করে। বিশেষ করে সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ফোন করার ঘটনা বেশি ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় পরিবারের সদস্যদের পক্ষে ফোনে দেওয়া তথ্য দ্রুত যাচাই করা কঠিন হয়।

ফলে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই প্রতারকের দেওয়া মোবাইল নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে তারা বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
অনেক ভুক্তভোগী টাকা হারানোর পরও অভিযোগ করেন না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে কারাগারে থাকা স্বজনকে নিয়ে আরও ঝামেলায় পড়তে পারেন।

‘হাত-পা ভেঙে দেওয়ার’ ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি

ঢাকার ধামরাইয়ের মনসুর আহমেদ জানান, কাশিমপুর-২ কারাগারে আটক তার এক আত্মীয়কে নিয়ে প্রতারকরা তাকে ফোন করেছিল।
মনসুর বলেন, ‘একদিন সকাল ৭টার দিকে আমি একটি ফোন পাই। ফোনে বলা হয়, আমার ওই আত্মীয় কারাগারের ভেতরে মারামারি করেছেন। এ কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। টাকা না দিলে তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হতে পারে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।’
ওই ব্যক্তি প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে দর-কষাকষি করে ১০ হাজার টাকা দিতে বলেন। পরে মনসুর জানতে পারেন, কারাগারে মারামারি বা শাস্তির পুরো ঘটনাটিই ছিল মিথ্যা।

নির্বাচনের আগে মুক্তির তালিকায় নাম

চট্টগ্রামের ডবলমুরিংয়ের সুজন দাশও প্রতারকদের টার্গেট হন। এক ব্যক্তি নিজেকে কারা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করেন। তিনি জানান, সুজনের ভগ্নিপতি সুমন দাশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। জাতীয় নির্বাচনের আগে যেসব বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হবে, তাদের একটি তালিকায় সুমনের নাম রয়েছে। তবে তাকে মুক্ত করতে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে।
সুজন ওই ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে দুটি মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে ৫০ হাজার ৩০০ টাকা পাঠান। পরে জানতে পারেন, পুরো বিষয়টিই ছিল প্রতারণা।

র‍্যাবের রিমান্ডের কথা বলে টাকা দাবি

সাভারের ইয়ারপুরের জাকির হোসেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়ের করা কয়েকটি হত্যা মামলায় কাশিমপুর-২ কারাগারে আটক রয়েছেন। তার স্বজনদেরও ফোন করে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়।

স্বজনদের ফোন করে বলা হয়, জাকিরকে র‍্যাব-১ রিমান্ডে নিয়ে গেছে। রিমান্ডে তাকে নির্যাতন করা হতে পারে। নির্যাতন বন্ধ করতে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। তবে জাকিরের পরিবার টাকা দিতে রাজি হয়নি। তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, তাকে রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়ে আদালতের কোনো আদেশই নেই।

র‍্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম খান টাইমসকে বলেন, আগের পাঁচ মাসে র‍্যাব-১ কারাগার থেকে কাউকে রিমান্ডে নেয়নি।

অসুস্থতার কথা বলে টাকা

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রবিন আহমেদের স্বজনেরাও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, রবিন কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই কথা বলে তার স্বজনদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

রাজশাহীর বাগমারার আমির হোসেনও একই ধরনের ঘটনার কথা জানান। তার পরিবারকে ফোন করে বলা হয়, তার ছোট ভাইয়ের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন এবং তাকে হাসপাতালে নিতে হবে।

এই কথা শুনে পরিবারটি ১০ হাজার টাকা পাঠায়। পরে তারা জানতে পারে, ছোট ভাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসার প্রয়োজনের কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

দ্রুত জামিনের কথা বলে টাকা

নারায়ণগঞ্জে মনির মিয়াও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার ভাগনে আবির জমি-সংক্রান্ত একটি মামলায় আটক ছিলেন।

এক ব্যক্তি মনিরকে ফোন করে বলেন, টাকা দিলে আবিরকে দ্রুত জামিনে মুক্ত করে দেওয়া যাবে। এই কথা বিশ্বাস করে মনির ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে মনির বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারিত হয়েছেন।
মানিকগঞ্জ কারাগারে আটক হত্যা মামলার এক আসামির স্বজনরাও একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন। রিমান্ড বাতিল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
যশোরের সাজল আহমেদ এবং খুলনার ফয়সাল মাহমুদের পরিবারের সদস্যদেরও একই ধরনের প্রতারণার টার্গেট করা হয়।

বন্দীদের পরিবারের অসহায়ত্বকে কাজে লাগায় প্রতারকরা

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, বন্দীদের পরিবারের সদস্যদের অসহায়ত্ব ও উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করছে চক্রগুলো।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘প্রতারক চক্রগুলো অত্যন্ত সংগঠিত। কারা কর্তৃপক্ষ যদি পরিবারের সদস্যদের জন্য সহজে যোগাযোগ করা যায়—এমন সরকারি ফোন নম্বর সরবরাহ করে, তাহলে এ ধরনের প্রতারণা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর