এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বরিত হৃতি ভোরদের বাসায় ধানের কুঁড়ার তেল বা রাইস ব্র্যান অয়েলে রান্না হয়। এই সময়ে সয়াবিন তেলের তুলনায় এই তেলের দাম বেড়েছে খুবই কম, ফলে পরিবারটিতে ভোজ্যতেলের খরচে চাপ তুলনামূলক কম বেড়েছে।
২০১০ সালে যখন এই তেল বাজারে আসে, সে সময় প্রতি লিটারের দাম ছিল ১৮৫ টাকার আশেপাশে। দীর্ঘ ১৬ বছর পরও এক লিটার রাইস ব্র্যান অয়েল পাওয়া যাচ্ছে ২২০ টাকার মধ্যে, এমনকি সুপার শপগুলোতে পাঁচ লিটারের বোতল ছাড়ে ১ হাজার ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। অথচ একই সময়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়েছে।
আমদানিনির্ভর ভোজ্যতেলের বাজারে রাইস ব্র্যানের বড় সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশ তার বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কাজে লাগাতে পারছে। পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা গেলে দাম আরও কমানো সম্ভব হতো।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে, দেশে বার্ষিক উৎপাদিত সাড়ে চার কোটি টনের বেশি ধান থেকে প্রায় সাত লাখ টন অপরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
নওগাঁর চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, মোটা ধান হলে প্রতি টনে ১২০ কেজি এবং চিকন ধান হলে ১০০ কেজি কুঁড়া পাওয়া যায়। সেই হিসাবে দেশীয় ধান থেকে বছরে ৪০ লাখ টনেরও বেশি কুঁড়া পাওয়া সম্ভব। ধানের কুঁড়ায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত তেল থাকে, তবে বাণিজ্যিক মিলগুলোতে গড়ে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ অপরিশোধিত তেল নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়।
প্রতি লিটার তেল উৎপাদনে প্রয়োজন হয় ৬ থেকে ৭ কেজি কুঁড়া। অর্থাৎ এই খাত থেকে দেশীয় বার্ষিক চাহিদার ৩১ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব, যা ভোজ্যতেল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাত। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল সংগ্রহের জটিলতা, সীমিত দেশীয় বাজার এবং রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিল্পটির পূর্ণ বিকাশ ঘটছে না।
বর্তমানে দেশের প্রায় ২০টি কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে চার লাখ টন হলেও বাস্তবে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টন। ফলে প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৬৭ হাজার টন সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য মোট উৎপাদনের হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৪০ শতাংশ।
কাঁচামাল সংকট প্রসঙ্গে মজুমদার ব্রান অয়েলস লিমিটেডের ম্যানেজার দেবব্রত মল্লিক টাইমসকে জানান, ধানের কুঁড়ার সংকটে উৎপাদন বাড়ার বদলে উল্টো কমছে। আর এই সংকটের মূল কারণ বিদ্যুতের লোডশেডিং। আগে একটি রাইস মিল থেকেই প্রতিদিন এক গাড়ি কুঁড়া পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমানে পাঁচটি মিল মিলিয়েও এক গাড়ি কুঁড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও যেখানে দিনে ২৫ থেকে ৩০ গাড়ি কুঁড়া সংগ্রহ করা যেত, তা কমে এখন পাঁচ গাড়িতে নেমেছে। মজুমদার ব্রান অয়েলসের নোয়াপাড়া ও চেঙ্গুরিয়ার দুটি ইউনিটের দৈনিক কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা যথাক্রমে ৫০০ ও ৪০০ টন হলেও কাঁচামালের অভাবে সেগুলো চালানো যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, গত দুই মাস ধরে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক রাইস ব্র্যান অয়েল মিল একই সংকটে ভুগছে।
অন্যদিকে, মজুমদার প্রোডাক্টস লিমিটেডের প্রতিনিধি রঞ্জন চক্রবর্তী জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগে দেশে রাইস ব্র্যান অয়েল কারখানা ছিল ১১ থেকে ১২টি, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ থেকে ১৯টিতে। কিন্তু কারখানার সংখ্যা বাড়লেও কাঁচামালের সরবরাহ বাড়েনি। একটি বড় প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন রাইস ব্র্যান প্রয়োজন হয়, অথচ বছরে দুই মৌসুম মিলিয়ে মাত্র পাঁচ মাসের মতো কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়।
শুরুর দিকে বাংলাদেশের রাইস ব্র্যান অয়েল শিল্প মূলত রপ্তানিনির্ভর ছিল এবং ভারতে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হতো। বিটিটিসির ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হচ্ছিল। পরবর্তীতে টিসিবির মাধ্যমে বাজারজাত করায় দেশীয় বাজারে এর পরিচিতি ও চাহিদা বাড়ে। গত ২০ মে সরকার স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
দেশীয় বাজারে সরবরাহ বাড়াতে সরকার গত দুই বছরে কয়েক দফা রপ্তানি শুল্ক পরিবর্তন করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে মেয়াদ শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয় এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুনে আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে সব ধরনের রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
বিটিটিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৭৫ হাজার টন তেল রপ্তানি করে আয় হয় প্রায় ৯৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে আরও ৫৮ হাজার টন তেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল প্রশ্ন—দেশীয় বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে সয়াবিন ও পাম অয়েলের আমদানিনির্ভরতা কমানো হবে, নাকি রপ্তানি আয়ের দিকে নজর দেওয়া হবে। বিটিটিসির বাণিজ্য নীতি বিভাগের উপ-প্রধান মাহমাদুল হাসান টাইমসকে বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার যদি ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো হয়, তবে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে সয়াবিন ও পাম অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমানোর বড় সুযোগ রয়েছে। তবে রপ্তানির মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হলে সেটিও অর্থনৈতিক বিবেচনায় রাখতে হবে।
রপ্তানির যৌক্তিকতা তুলে ধরে মাহমাদুল হাসান বলেন, যদি সয়াবিন বা পাম অয়েল আমদানিতে ১৫ টাকা ব্যয় হয় এবং একই পরিমাণ রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানি করে ৩০ টাকা আয় করা যায়, তবে রপ্তানিই অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক। ফলে স্থানীয় বাজার নাকি রপ্তানি-কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা একটি নীতিগত ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারদর, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, খাতটির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, দ্রুত কুঁড়া সংগ্রহের ব্যবস্থা, কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং স্থিতিশীল বাজারনীতি অত্যন্ত জরুরি।


