মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের বাবাকে হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। মায়ের আবারও বিয়ের পর তাকে একটি হোস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা তাকে মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তীব্র একাকীত্ব এক দমবন্ধ করা বিষণ্ণতায় রূপ নেয়। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়, এই জীবন আর বহন করা সম্ভব নয়।
তিনি দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, দুবারই তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা চরম ঝুঁকিতে থাকেন—চিকিৎসকদের এমন সতর্কতা সত্ত্বেও তার পরিবার কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি তার বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং সেবা দিতে ব্যর্থ হয়। তিনি নিজেও কখনো বাইরের কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেননি।
তার এই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা আসলে দেশের এক বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, যা দেশের হত্যাকাণ্ডের হারের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পুলিশের সরকারি নথিতে অন্তত ৭৬ হাজার ৩৬১টি আত্মহত্যার ঘটনা নিবন্ধিত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের একটি জরিপে ২০ হাজার ৫০৫টি আত্মহত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, ব্যাপক সামাজিক কুসংস্কার ও অপবাদের ভয়ে অনেকেই এই তথ্য গোপন করেন। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই আরও অনেক বেশি।
প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি সত্ত্বেও এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত অপ্রতুল। আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কিংবা সহজে গ্রহণযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশে এখনো কোনো শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
দুবার জীবন বাঁচল, কিন্তু সহায়তা মেলেনি
একটি যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ১৭ বছর বয়সে ওই শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। যাকে ঘিরে তিনি জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই শিক্ষার্থী। হোস্টেল কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও জরুরি চিকিৎসার ফলেই সেবার তিনি বেঁচে যান।
কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় বাড়িতে ফিরতে বাধ্য হওয়ার পর তার মানসিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। মা ও সৎবাবার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে। তার মনে হতে থাকে, তিনি নিজেই সংসারের প্রতিটি অশান্তির মূল কারণ। তিনি না থাকলেই তার পরিবার শান্তিতে থাকবে।
তার দ্বিতীয় চেষ্টার বিষয়টি ছিল আরও ভয়াবহ। এর আগে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও, এবার তিনি নিজের শরীরে মারাত্মক আঘাত করেন। এবারও মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘ওই দিনগুলোর কথা ভেবে এখনো আমার মন গভীর কান্নায় ভরে ওঠে। সেদিন না বাঁচলে আজকের এই জীবনটা আমার কখনোই দেখা হতো না।’ তবে গভীর হতাশার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে গিয়ে তার এই জীবনের সংগ্রাম এখনো অব্যাহত আছে।
বেঁচে যাওয়াদের নজরদারির কোনো ব্যবস্থা নেই
আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরাই যে পরে আবারও আত্মহত্যার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, সে ব্যাপারে চিকিৎসকরা একমত। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এদের নজরদারিতে রাখার মতো কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা নেই। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত এক গবেষণায় এই নজরদারির অভাবকে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধমূলক ডেটাবেজ তৈরির সুপারিশ করা হয়।
নীতিগত পর্যায়ে কিছু লক্ষ্য অবশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি ২০২২’ এবং ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০’-এ আত্মহত্যা প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে এর বাস্তবায়ন একেবারেই থমকে আছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিকল্প তথ্য কর্মকর্তা শেখ মো. মাসুদুল হক টাইমসকে জানান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বাইরে বর্তমানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোনো বিশেষায়িত জাতীয় প্রকল্প চালু নেই। এই শূন্যস্থানটি মূলত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো দিয়েই চলছে।
সেবা গ্রহণের পথে বাধা সেকেলে আইন
আইনগত জটিলতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা এখনো একটি ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরাধীকরণ নীতি জনস্বাস্থ্যের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ‘বিএমজে ওপেন’-এ প্রকাশিত ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, সেসব দেশে আত্মহত্যার হার মোটেই কম নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা বেশি।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, এই অপরাধীকরণ ব্যবস্থা মানুষের মনে ভয়, লজ্জা ও গোপনীয়তার জন্ম দেয়, যা সংকটগ্রস্ত ব্যক্তিদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা নেওয়া থেকে বিরত রাখে।
আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলোও এই আইন সংস্কারের দিকেই নির্দেশ করে। শ্রীলঙ্কা ১৯৯৮ সালে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধমুক্ত করে। পরবর্তীতে সেখানে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, যার পেছনে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণের কঠোর আইনও ভূমিকা রেখেছিল। ২০২০ সালে সিঙ্গাপুরও একই পথ অনুসরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, অপরাধীমুক্ত করার পরবর্তী নয় মাসে সিঙ্গাপুরে আত্মহত্যার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
প্রয়োজন কমিউনিটি-ভিত্তিক হস্তক্ষেপ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের উপ-পরিচালক শুভাশীষ কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, শুধু আইন করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এটি ঠেকানো যায় না। বরং শাস্তির ভয়ে মানুষ তাদের আত্মঘাতী চিন্তাভাবনাগুলো লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়।’
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা কেন্দ্রের বাইরেও সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহপাঠীদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত যাতে তারা দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, অনবরত বিষণ্ণতা, স্বপ্রণোদিত আঘাত বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো প্রাথমিক সতর্কসংকেতগুলো চিহ্নিত করতে পারে। বন্ধুদের মধ্যে একটি বিশ্বস্ত সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বছরজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ৩১০ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৩ জনে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল স্কুল শিক্ষার্থী, ১৯০ জন। এ ছাড়া ছিলেন ৯২ জন কলেজ শিক্ষার্থী, ৭৭ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং ৪৪ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীদের ৬০ শতাংশই নারী।
মানসিক বিষণ্ণতা, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, প্রেমঘটিত সমস্যা, পারিবারিক কলহ এবং যৌন নির্যাতন ছিল এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি সাইবার বুলিংকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট শিক্ষার্থী আত্মহত্যার প্রতি ১০টির মধ্যে ৩টিই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ঘনবসতি, শহরের মানসিক চাপ, পড়াশোনায় তীব্র প্রতিযোগিতা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এখানকার শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গ্রামীণ অঞ্চলের উপেক্ষিত সংকট
এই সংকট কেবল বড় বড় শহর আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কাগজে-কলমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে তা কার্যকর নয়।
শুভাশীষ চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, ‘শুধু কাউন্সেলর নিয়োগ করলেই দুর্গম গ্রামগুলোতে সেবা পৌঁছাবে না। স্থানীয় প্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করে সমাজভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণের মতোই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন।’
আপাতত সরকারি উদ্যোগ অপ্রতুলই রয়ে গেছে, যার ফলে কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষাজাল ছাড়াই হাজার হাজার মানুষ নীরবে তাদের অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।


