নিজ বাড়িতে গবাদি পশুর রক্ষণাবেক্ষণ করতেন ৪৮ বছরের অজিত সরকার। গত ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষায় তার রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অজিত সরকারের স্ত্রী কালিতারা জানান, পরীক্ষায় তার শরীরে ‘লেপ্টোস্পাইরোসিস’ রোগ ধরা পড়েছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের জীবাণু সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর বর্জ্য কিংবা মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়।
পশুর মাংস ও পশু জবাইয়ের সঙ্গে ভয়াবহ সংক্রমণের এই যোগসূত্র বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। গত বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অসুস্থ গবাদিপশু জবাই ও সেই মাংস প্রক্রিয়াজাত করার কারণে মাত্র দুই মাসে রংপুরে ১৭ জন এবং গাইবান্ধায় ৮ জনসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় মোট ২৫ জনের শরীরে প্রাণঘাতী ‘অ্যানথ্রাক্স’ শনাক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ এই ঝুঁকিটি শুধু মাংস খাওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পশু রক্ষণাবেক্ষণকারী, কসাই, মাংস ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে বিক্রেতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
দেশে পশু জবাই করার আগে যেসব আইনগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাবধানতা অবলম্বনের নিয়ম রয়েছে, তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। ফলে পশুটি কোনো রোগে আক্রান্ত কি না বা এর মাংস মানবদেহের জন্য কতটা বিপজ্জনক, সেই মৌলিক তথ্যের তোয়াক্কা না করেই প্রতিদিন মানুষ বাজার থেকে মাংস কিনছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, অসুস্থ পশুর মাংস খেলে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পশু ভাইরাসে আক্রান্ত থাকলে ভোক্তাও সংক্রমিত হতে পারেন। তাই জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
তিনি আরও জানান, নির্দিষ্ট ও স্বাস্থ্যসম্মত স্থানে পশু জবাই না হলে জবাইয়ের স্থান থেকেই রোগজীবাণু মাংসে সংক্রমিত হতে পারে। পাশাপাশি খোলা জায়গায় পশু জবাইয়ের ফলে জমা হওয়া রক্ত ও বর্জ্য জীবাণু ছড়ানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে, যা আশপাশের মানুষের জন্যও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
নিরাপদ মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাজধানীর হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক জবাইখানা নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে ভেটেরিনারি সার্জন দিয়ে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বয়ংক্রিয় উপায়ে মাংস প্রক্রিয়াজাত করার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো সুফল মিলছে না। কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ধুলার আস্তরে ঢেকে গেছে।
বাড্ডা, পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাজার ও অলিগলিতে এখনো উন্মুক্ত রাস্তায় কিংবা দোকানের পাশের ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাই করা হচ্ছে। পশুটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত কি না বা মানুষের খাদ্য হিসেবে উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে সেখানে দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, সূত্রাপুরে বাজারের পেছনের একটি কক্ষে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন সকালে গরু জবাই করেন এবং সাধারণ মানুষ সেখান থেকেই মাংস কেনে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম টাইমসকে বলেন, বিক্রির আগে মাংস পরীক্ষা করে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সিল থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক জবাইখানার বাইরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশু জবাই করা হলে তা সুস্থ ছিল কি না বা সঠিকভাবে জবাই হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ থাকে না।
অথচ পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়া খোলা স্থানে পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনে স্পষ্ট বলা আছে, জবাইখানায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক পরীক্ষা করে অনুমতি দেওয়ার পরই পশু জবাই করা যাবে এবং শেষে মাংসে সরকারি সিল দিতে হবে। বাস্তবে মাংসের দোকানগুলোতে এই সরকারি সিলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রকৌশল বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালে উদ্বোধনের দিন হাজারীবাগ জবাইখানায় গরু জবাই করা হয়েছিল। কিন্তু গত সাত বছরে সেখানে আর কোনো পশু জবাই হয়নি। অথচ ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক কেন্দ্রটিতে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল জবাই করার সক্ষমতা রয়েছে।
স্থানীয় চায়ের দোকানদারদের সূত্রে জানা যায়, মাঝেমধ্যে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিদর্শনে আসলে প্রদর্শনী হিসেবে কিছু পশু এনে জবাই করা হলেও পরে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে মাংস বিক্রেতাদের দাবি, পশু জবাইয়ের কাজ শেষ করতে হয় ভোরবেলায়। কিন্তু সে সময় সিটি করপোরেশনের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না। আবার অনেক সময় বিকালে কর্মকর্তা এলে ততক্ষণে মাংসের বড় অংশই বিক্রি হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইজারা না হওয়া এবং পরিচালনায় সক্ষমতার ঘাটতির কারণেই মূলত ৮১ কোটি টাকার এই আধুনিক অবকাঠামো কাজে আসছে না। এ কারণে সিটি করপোরেশন এখন এটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালানোর পরিকল্পনা করছে। হাজারীবাগের জবাইখানাটি তিন বছরের জন্য ইজারা দিতে প্রথম দফায় ইজারামূল্য ধরা হয়েছিল ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি। পরে তা কমিয়ে ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা করা হলেও কোনো ব্যবসায়ী দরপত্র জমা দেননি।
ব্যবসায়ীদের মতে, অলিগলিতে বা দোকানের সামনে জবাই করলে পরিবহন খরচ ও অতিরিক্ত ফি বেঁচে যায় এবং সময়ও কম লাগে। এই বাস্তবতায় নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাস্তবসম্মত বিজনেস মডেল, কঠোর আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও উপযুক্ত জবাবদিহি নিশ্চিত করেই কেবল এই প্রকল্পগুলোকে সচল ও সফল করা সম্ভব।
মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বছরের পর বছর কোনো প্রকার স্বাস্থ্যসুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ পরিচালনা করে আসায় তারাও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গবাদি পশু রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তি, কসাইখানা কর্মী ও মাংস হ্যান্ডলাররা সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দল। চিকিৎসা পেতে দেরি হলে লেপ্টোস্পাইরোসিসের কারণে কিডনি ও লিভার বিকল, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ এবং একাধিক অঙ্গ অকার্যকর হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, গুরুতর লেপ্টোস্পাইরোসিসে আক্রান্তদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাল্টিঅর্গান ফেইলিউর ও মৃত্যু ঘটে।


