স্বামী অসুস্থ থাকায় নয় বছরের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে রয়েছেন খাদিজা। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে স্বামীর চিকিৎসা নিয়ে বাড়তে থাকা দুশ্চিন্তার পাশাপাশি তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন এক উদ্বেগ: হাসপাতালের খাবার সরবরাহের সময়সূচি। আগে যেখানে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই রাতের খাবার চলে আসত, এখন তা প্রায়ই রাত ১০টার আগে পাওয়া যায় না।
নিজের বাবার চিকিৎসা করাতে গত তিন মাস ধরে হাসপাতালে থাকা পিংকি আক্তারও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো খাবার ঠিকমতো সেদ্ধও হয় না। শুনলাম হাসপাতালে নাকি তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, আর সে কারণেই রান্না করতে এত দেরি হচ্ছে।’
দেশের সর্ববৃহৎ এই টারশিয়ারি ও রেফারেল হাসপাতালে গ্যাস সংকট এখন হাজারো রোগী ও তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদের জন্য ভিন্নরকম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতালের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। কারণ রান্নার মূল সময়গুলোতে পাইপলাইনের গ্যাস বলতে গেলে একেবারেই থাকে না। মধ্যরাত থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত অল্প কিছু গ্যাস মিললেও এরপর চাপের পরিমাণ একেবারে শূন্যে নেমে আসে।
সাধারণত হাসপাতালের রান্নাঘরে সকালের নাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয় ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। আর রাতের খাবার প্রস্তুত করা হয় বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। কিন্তু এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই কোনো গ্যাস পাওয়া যায় না।
রান্নাঘরের কার্যক্রম চালু রাখতে হাসপাতালের প্রায় ৫০ শতাংশ চুলা সিলিন্ডার গ্যাসে (এলপিজি) রূপান্তর করা হয়েছে বলে টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তবে এই সাময়িক ব্যবস্থা তাদের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, ‘চার হাজার থেকে চার হাজার ২০০ রোগীর খাবারের ব্যবস্থা করতে আমাদের প্রতিদিন ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা শুধু গ্যাস সিলিন্ডার বাবদ খরচ করতে হচ্ছে। আপাতত হাসপাতালের নিজস্ব বাজেট থেকেই এই খরচ চালানো হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করে চলা আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।’
হাসপাতালের স্টুয়ার্ড বেল্লাল হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘যদিও মধ্যরাত থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কিছু গ্যাস পাওয়া যায়, তবে এরপরই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমাদের ভাত রান্না ও প্রধান প্রধান খাবারগুলো তৈরি করে ফেলতে হয়। এ কারণে রান্নাঘরের কর্মীদের প্রায়ই রাত ২টায় কাজে যোগ দিতে হয়, রান্না চালিয়ে যেতে হয় একটানা ৩টা পর্যন্ত।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত প্রায় দুই মাস ধরে এই সংকট অব্যাহত রয়েছে।
রান্নাঘরের কর্মীরা জানিয়েছেন, বোতলজাত গ্যাস মেপে মেপে ব্যবহার করতে হয় বলে সব খাবার একবারে রান্না না করে ধাপে ধাপে প্রস্তুত করতে হচ্ছে। সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে হাসপাতালের ২৪টি বাণিজ্যিক চুলার সবকটি একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না।
এর ফলে যে পরিমাণ খাবার আগে একবারেই রান্না করা যেত, তা এখন একাধিক ধাপে করতে হচ্ছে। এতে রান্না শেষ হতে যেমন অতিরিক্ত সময় লাগছে, তেমনি কর্মীদের কায়িক পরিশ্রম ও ক্লান্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বাবুর্চি আবুল হোসেন পাটোয়ারী জানান, মূল লাইনের সরবরাহ বন্ধ থাকায় পুরো রান্নার প্রক্রিয়া এখন বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে, যা সরাসরি রোগীদের খাবারের সময়ে প্রভাব ফেলছে।
স্বাভাবিক সময়ে রোগীদের রাতের খাবার দেওয়া হতো মাগরিবের নামাজের কাছাকাছি সময়, অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে খাবার বিতরণে নিয়মিত কয়েক ঘণ্টা দেরি হচ্ছে–যা কখনো কখনো রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত গড়ায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাভাবিক গ্যাসের চাপ ফিরিয়ে আনার জন্য তারা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি।
এই সংকট প্রশাসনিক জটিলতারও সৃষ্টি করেছে। লাইনের সংযোগ সচল থাকা অবস্থায় বোতলজাত গ্যাস কেনার জন্য অফিশিয়াল অনুমোদন পেতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান উল্লেখ করেন, ‘রাষ্ট্রীয় গ্যাস সংযোগ চালু থাকা অবস্থায় আমরা যদি বোতলজাত গ্যাসের খরচ দেখাই, তবে তা অডিট আপত্তির ঝুঁকি তৈরি করে। খাবার তৈরির জন্য সিলিন্ডার গ্যাস কেনার আনুষ্ঠানিক অনুমতির আবেদন জানিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। তবে সেই অনুমোদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
চলমান এই সংকটের কারণে কর্মচারীদের শিফট বা কাজের সময়সূচিতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। রাতের শিফটের কর্মীরা এখন মধ্যরাত ২টায় এসে সকাল পর্যন্ত রান্না করছেন। অন্যদিকে বিকালের শিফটের কর্মীদের সকাল ১০টা থেকে শুরু করে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।


