কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে চিরকুটে চাঁদা দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে অন্তত ৩০টি পরিবার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ভয়ে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। গত দুই মাস ধরে চলা এই ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের কুর্শা, ইশেলমারী, পুটিমারী ও ভেদামারী গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গভীর রাতে বা নিরিবিলিতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা চিরকুট বা চিঠি ফেলে যায়। চিঠিতে ‘পূর্ববাংলা পার্টি’ ও তাদের ‘চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল’-এর নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
চিঠিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম, কত টাকা দিতে হবে তার সুনির্দিষ্ট অঙ্ক, বিকাশ নম্বর কিংবা টাকা হস্তান্তরের স্থান উল্লেখ করা থাকে। কোথাও কোথাও দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা আবার কোথাও কোথাও এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি চিঠিগুলোতে পরিবারগুলোর এমন কিছু গোপন ও ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করা হচ্ছে, যা দেখে ভুক্তভোগীরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসে এমন একটি চিরকুট। তাতে লেখা রয়েছে, ‘সালাম নিন, আশা করি ভালো আছেন। পূর্ব বাংলা পার্টির পক্ষ থেকে নিম্ন নামধারী পরিবারের কাছ থেকে ৫০০০ করে টাকা দিতে হবে। (এরপরে ১২ জনের নামের তালিকা দেওয়া রয়েছে) দুদিনের মধ্যে আনোয়ারের কাছে দিয়ে দেবেন, আমরা নিয়ে নেব।’ নিচে লেখা রয়েছে, ইতি জীবন/জাহান।
আরেকটি চিরকুটে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে বলা হয়েছে, এক বছর আগে মারধর ও মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে এক তরুণের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে। চিঠিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডা. মিজানকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়। চিঠির শেষে লেখা, ‘পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে, আল মামুন রাজ, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের পুটিমারা গ্রামের একটি বাড়ি প্রায় দুই মাস ধরে তালাবদ্ধ। পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে আত্মীয়দের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাস দুয়েক আগে ওই বাড়ির দরজায় একটি চিঠি রেখে যায় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। চিঠিতে চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয়।
আরেকটি চিরকুটে বলা হয়েছে, ‘আহসান বিকাশ দোকানদার, পুটিমারা দোকানের কাছে টাকা দেবে। পার্টি যোগাযোগ করে নেবে।’ শেষে লেখা, ইতি পূর্ব বাংলা, চুয়াডাঙ্গা।
শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন নয়, বিভিন্ন চিঠিতে আলাদা আলাদা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা পাঠাতে নির্দিষ্ট বিকাশ এজেন্টের নম্বরও দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইশেলমারী বাজার কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেনের কাছেও এ ধরনের চিঠি পৌঁছেছে। এরপর একই কায়দায় আরও অন্তত ১২ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় গত ৪ জুলাই নিরাপত্তা চেয়ে মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন মো. মিজানুর রহমান। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, জগলুর করিমের মাধ্যমে তিনি দুই পাতার একটি চিঠির বিষয়ে জানতে পারেন। ওই চিঠিতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা পূর্ববাংলা পার্টির নাম ব্যবহার করে রহিমা খাতুনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না দিলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
জিডিতে চিঠির মাধ্যমে দেওয়া হুমকির কারণে নিজের ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের সব লোককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি একটি জিডি করেছিলাম। আমরা গ্রামের প্রধান মিলে সবাই সজাগ রয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্ত করছে।’
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নাম ও ঠিকানা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা দেখে তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারা এসব চিঠি দিচ্ছে, তারা এলাকায় ঘোরাফেরা করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
এক ভুক্তভোগী বলেন, চিঠি পাওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছি। কারা এই চিঠি দিচ্ছে, সেটা দ্রুত বের করা দরকার।
আরেকজন বলেন, টাকা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকে বাড়িতে থাকতেও ভয় পাচ্ছেন।
চিরকুটে উল্লেখ করা ডা. মিজান ও বিকাশ দোকানদার আহসানের মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহল বলছে, মিরপুরের এই এলাকাগুলো একসময় চরমপন্থী তৎপরতার জন্য পরিচিত ছিল। আশির দশকে এ অঞ্চলে বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের তৎপরতা ছিল। এসব চিঠি সত্যিই কোনো চরমপন্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, নাকি তাদের নাম ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজির চেষ্টা করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে রহস্য উদঘাটনের দাবিও জানান তারা।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি চরমপন্থী সংগঠনের কথা শুনেছি। কিন্তু আদৌ অস্তিত্ব আছে কিনা এটা বলতে পারব না। ৯০ দশকের দিকে শুনেছি। এখন শোনা যায় না।’
এ বিষয়ে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, চাঁদা দাবির ঘটনায় থানায় কয়েকটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বাসিন্দাদের ভয় দূর করতে এলাকায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছি। এর পেছনে যেই হোক না কেন, দ্রুত রহস্য উদঘাটন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


