বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে পদত্যাগ করেছেন শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। স্থানীয় সময় বুধবার তিনি পদত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের আলাদা জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তাধীন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স পুতুলের পদত্যাগপত্রের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার প্রভাব রাজনৈতিক মিত্রদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ওপরও পড়েছে। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ঘটনা তারই একটি উদাহরণ। তার অনেক রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি। তাদের কেউ কেউ হাসিনার মতো স্বেচ্ছানির্বাসনেও রয়েছেন।
পাঁচ বছরের মেয়াদে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের শেষ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ওই বছরের মার্চে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও নথি জাল করার অভিযোগ আনার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পুতুলের আইনজীবীরা ২০২৬ সালের ৩ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে পাঠানো আলাদা এক চিঠিতে দাবি করেন, সংস্থাটি তার বিরুদ্ধে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। শেখ হাসিনা কন্যা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকে পাঠানো পদত্যাগপত্র অনুযায়ী, সংস্থাটি আঞ্চলিক প্রধানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অবৈধভাবে একটি জমির প্লট নেওয়ার অভিযোগও তুলেছিল।
তবে পুতুলের দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি পেয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন বলেও দাবি করেন।
বুধবার রাতে তেদ্রোসকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘আমি আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং আমি আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছি।’
‘আপনি যেহেতু আমাকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে বাধা দিয়ে যাচ্ছেন, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া, আমাকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর ওই সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে রয়েছেন। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার কথা উল্লেখ করে তার বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সংস্থাটি।
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফিরতে চান হাসিনা
এর আগে দুটি সূত্র জানিয়েছিল, জাতিসংঘের সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পুতুলকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ওই দুটি সূত্র নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
এক সূত্রের তথ্যমতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগামী ১২ অক্টোবর ওই পদে মনোনয়ন আহ্বানের ঘোষণা দেবে। ডিসেম্বরে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে এবং ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকেরা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্বাস্থ্যনীতি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম। রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি বাস্তবায়ন তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
প্রতি পাঁচ বছর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতও রয়েছে।
গত ৩ জুলাইয়ের চিঠিতে আইনজীবীদের মাধ্যমে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত ভ্রমণ ব্যয় ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় তার এক সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে ৯০১ ডলারের অমিল পাওয়া যায়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছেন। এই যোগ্যতার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোসের কাছে তিনি আগে থেকেই স্পষ্ট তথ্য দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।


