সন্ধ্যার পর কোনো সরকারি হাসপাতালের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। আর খুব সম্ভবত তখনই দেখবেন, আশেপাশের কোনো হাসপাতালের নামটাই পড়া কঠিন হয়ে গেছে। একটি-দুটি অক্ষরের আলো মাস কয়েক আগে নীরবে নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ তা আর বদলায়নি। ফলে যা অবশিষ্ট আছে, তা আর হাসপাতালের পুরো নাম নয়—নামের একটি খণ্ডমাত্র।
প্রথমে বিষয়টি হাস্যকর মনে হতে পারে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এমন ভাঙাচোরা সাইনবোর্ডের ছবি মানুষ নিছক হাসি-তামাসার ছলে উড়িয়ে দেয়। মনে হয় যেন, রাতারাতি ভুলবশত কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের নামই বদলে ফেলেছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই বোঝা যায়, এটি মোটেই তামাসার বিষয় নয়, বরং কঠিন বাস্তবতা।
ঢাকার সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরগুলোর মতো একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন দৃশ্য বারবার দেখা যায়। অথচ কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিষয়টিকে ঠিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে না করায় সেই কাজ পড়ে থাকে। এখানে বিদ্যুৎ সংকট কোনো অজুহাত হতে পারে না। বরং হাসপাতালের এই ভাঙা সাইনবোর্ডই যেন স্বাস্থ্যখাতে আমাদের সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। একটি সরকারি হাসপাতালের নাম এমনভাবে দৃশ্যমান হওয়া উচিত, যাতে মানুষ সহজেই সেটি চিনতে পারে। হাসপাতালের সাইনবোর্ড তো কোনো সাজসজ্জা নয়। এটি জীবনের প্রকৃত দুঃসময়ে হাসপাতালে আসা এক রোগী বা তার স্বজনদের জন্য প্রথম নির্দেশনা।

যখন কোনো হাসপাতালের সাইনবোর্ড এমন মাসের পর মাস নষ্ট অবস্থায় পড়ে থাকে, তখন সেই হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই সেখানে আসা প্রত্যেক জরুরি রোগী ও তার স্বজনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের মনোভাব বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়। আর এই সাইনবোর্ডই যতদিন না ঠিক হচ্ছে, তত দিন হাসপাতালে আসা সবার মনেই অবহেলিত হওয়ার এক সংশয় ক্ষণিকের জন্য উঁকি দেবে। আর এ বিষয়ই যখন আলাদা করে হিসেব করা হয়, তখন এই সমস্যাটি আর সামান্য থাকে না।
আর এই কারিগরি ব্যাখ্যাটি অবশ্যই যথেষ্ট বাস্তব। এ ধরনের পুরোনো সাইনবোর্ড সাধারণত হাই ভোল্টেজের স্বল্প বিদ্যুতে চলে। যেখানে টিউবগুলো সিরিজে সংযুক্ত থাকে। ফলে একটি ইলেকট্রোড নষ্ট হলেই একটি পুরো শব্দের আলো একসঙ্গে নিভে যেতে পারে।

এটি মেরামত করতে বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ, লিফট বা উঁচুতে ওঠার সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন ধরনের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। যার খরচ একটি বাল্বের দামের চেয়ে অনেক বেশি। প্রশাসকেরা সাধারণত এই যুক্তিটিই সামনে আনেন। কিন্তু খতিয়ে দেখলে এটিও আসলে একটি খোঁড়া অজুহাত।
আধুনিক লো-ভোল্টেজের বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, যা চালাতে খরচও অনেক কম। আর এ ক্ষেত্রে একটি বাল্ব নষ্ট হলে কেবল সেই বাল্বটিই নিভে যায়। সুতরাং এখানে প্রকৃত বাধাটা কখনোই প্রকৃতপক্ষে প্রযুক্তিগত ছিল না। বরং সমস্যাটি ছিল প্রশাসনিক। এ সমস্যা সম্পদের সংকটের কারণেও নয়। এটি আসলে একটি পদ্ধতিগত অবহেলার চিত্র। এমন নয় যে এসব প্রতিষ্ঠানের টাকা নেই, কিংবা তারা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহকে দায়ী করতে পারে, অথবা সমস্যাটি সমাধানের প্রযুক্তি নেই। শুধুমাত্র কেউ একজন অনুমোদন দেওয়ায় কিছু স্থানীয় সরকার এর মধ্যেই কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে তাদের সাইনবোর্ড আধুনিকায়ন করেছে।

সেসব এলাকার হাসপাতালগুলো রাতে স্পষ্টভাবে চেনা যায়। তাদের নাম অক্ষত, দৃশ্যমান। যেখানে মেরামত করা হয়েছে সেখানে সমাধান সম্ভব হয়েছে। এই বাস্তবতাই যেখানে মেরামত হয়নি, সেসব জায়গার জন্য বাড়তি অজুহাতও আসলে সেসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
এ বিষয়টি হয়তো ওই ভবনের ভেতরে পরিচালিত চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্মীদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে সৎ যোগাযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য এই বিষয়টি চিকিৎসাসেবার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এই মুহূর্তে অনেক জায়গায় যা আলোয় ভেসে উঠছে তার চেয়েও বেশি দরকারি একটি একটি করে নিভে যাওয়া বাল্বের আলোয় অবহেলিত হারিয়ে যাওয়া শব্দগুচ্ছ।


