হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে সতর্ক করল পাকিস্তান

হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে সতর্ক করল পাকিস্তান
Advertisement
Advertisement

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের ওপর ইরান সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠীটি হামলা বাড়ানোর পর এই সতর্কবার্তা দিল দেশটি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে অন্যতম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। সে কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংকট আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ এ বার্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ‘ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকার একটি বিমানঘাঁটি এবং আশপাশের কয়েকটি শহরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালায়। এতে অন্তত ৭৩ জন আহত হন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সৌদি আরবে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর আঘাত হানা সবচেয়ে বড় হামলা।

প্রায় একই সময়ে হরমুজ প্রনালিতে সবচেয়ে বড় নৌ সংঘাতে জড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের। মঙ্গল ও বুধবার দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় তেলবাহী জাহাজসহ অন্তত ১৫টি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বুধবার জানিয়েছেন, গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি বিমান বাহিনী ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং হামলাকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা পাকিস্তানের কঠোর বার্তা দেওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ‘মক্কা চুক্তির’ অধীনে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। তুরস্কের সঙ্গেও দেশটির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি থাকায় পাকিস্তানের এই সতর্কবার্তা ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের যেকোনো সামরিক ভূমিকা সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমিত থাকবে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবে হামলা ছড়িয়ে পড়লে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

পাকিস্তানের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসিফ বলেন, ‘চুক্তির অধীনে থাকা কোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসন তিনটি দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা বা সন্দেহ নেই। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে আগ্রাসন বা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এই চুক্তি অবশ্যই কার্যকর হবে।’

এ বিষয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

আরও পড়ুন

সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলা পাকিস্তান হুথি হামলার পর যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরানের কাছে পাকিস্তানের বার্তা স্পষ্ট- হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করুন, না হলে একটি আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাত বড় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হতে পারে।

একজন জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, সৌদিতে হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামাবাদ তেহরানের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। পাকিস্তান আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করেই ইরানকে সৌদি আরবের ওপর হুথি হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

দুটি ইরানি সূত্রও জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তেহরান হুথিদের সৌদি আরবে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তাদের দাবি, ইরান এ ধরনের হামলার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) কয়েকজন কমান্ডার ইয়েমেনে গিয়ে হামলার সমন্বয়েও সহায়তা করেছেন।

আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, সৌদি আরব রিয়াদের প্রতিরক্ষায় ইসলামাবাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা চাওয়ার মতো অবস্থায় পরিস্থিতি যাওয়ার আগেই পাকিস্তান হুথিদের থামাতে চাইছে।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের চুক্তি রয়েছে। তবে আমি আশা করছি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে না, যেখানে পাকিস্তানকে বাস্তবে মাঠে নামতে হবে। আপাতত তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকবে।’

সৌদি আরবকে সহযোগিতার বিষয়ে পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদে সৌদি কর্মকর্তারা পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিন দেশ তাদের প্রতিক্রিয়া সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা করেছে।

ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, তিন দেশ একমত হয়েছে যে তাদের সেনারা এখনই ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না এবং যেকোনো পদক্ষেপ সৌদি ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হবে।

আরেক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, পাল্টা হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি প্রতিরক্ষামূলক এবং তা শুধু সৌদি ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যে সীমিত। পাকিস্তানি বাহিনী সৌদি আরবের অভ্যন্তরে সামরিক, কারিগরি, স্থল বা আকাশ সহায়তা দিতে পারে। তবে বিদেশের মাটিতে কোনো যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে না।

আঞ্চলিক কূটনীতিক আরও বলেন, ইরান ও হুথিদের চাপ প্রয়োগের কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরানের বন্দর অবরোধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তেহরান সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ অন্য দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসছে না।

ওই কূটনীতিক বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় না আসা পর্যন্ত অবরোধ বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে কাতার দুই পক্ষকে আবার আলোচনায় ফেরাতে নতুন কিছু প্রস্তাব নিয়ে নীরবে কাজ করছে।

আরেক আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের সামরিক প্রতিক্রিয়া ইরান নয় বরং হুথিদের লক্ষ্য করেই থাকবে। সৌদি কর্মকর্তারাও মনে করেন, হুথিদের মাধ্যমে সৌদি আরবে হামলা তেহরানের বৃহত্তর লক্ষ্য নয়, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শেষ করতে পারবে।

ওই সূত্র জানায়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেবে না। কারণ ট্রাম্প মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপই আলোচনায় ফেরার সবচেয়ে কার্যকর পথ। সূত্রটি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, ইরান কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে এবং কতদিন তা চালিয়ে যেতে পারবে। ট্রাম্প সামরিক সমাধান চান না। তিনি অবরোধের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর