ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও মাজারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। তথ্য সংগ্রহের ধরন নিয়ে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজ্য সরকার আগে হাইকোর্টকে জানিয়েছিল, তারা এমন কোনো তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেয়নি। এরপরও জনস্বার্থের একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা শাখার নির্দেশে পুলিশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২১ দফার একটি ফরম পূরণ করতে বলেছে।
তবে হাইকোর্টের আগের এক আদেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা ও মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত তথ্য না চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর পরও কীভাবে এমন সমীক্ষা চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের ফরমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কিছু স্পর্শকাতর তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের মতাদর্শ, যেমন শিয়া, সুন্নি, হানাফি, হাম্বলি, দেওবন্দি ও বেরেলোভি। চাওয়া হয়েছে জিপিএস লোকেশন, বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে আকাশপথে দূরত্ব, জমির সীমানা, জমির মালিকানার ধরন ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নাম-ফোন নম্বর।
আর্থিক তথ্যের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কার অর্থে পরিচালিত হয়, বিদেশ থেকে কোনো অর্থ আসে কি না, গত তিন বছরে কোনো বিদেশি নাগরিক সেখানে এসেছেন কি না, এলে তাদের পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের সময় ও পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুর্শিদাবাদের নিমতিতায় গভীর রাতে পুলিশ মসজিদ কমিটির কাছে নোটিশ দিতে গেলে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। গভীর রাতে কেন নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষ বা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গোপনীয়তা ও মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। পুলিশি তথ্য সংগ্রহের নামে অযথা হয়রানি করা যাবে না বলেও আদালত সতর্ক করেছিল। এতে পুলিশের চাওয়া তথ্য আদালতের নির্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জমিয়তে উলামা হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি মাওলানা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘রাজ্যের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো সরকারি নিয়ম মেনেই তৈরি। এগুলোর সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। কাগজপত্র আবার জমা দিতে আপত্তি নেই। তবে কোনো সরকারি স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া গভীর রাতে থানার কর্মকর্তা গিয়ে এমন নোটিশ দেওয়া ঠিক নয়।’
অল বেঙ্গল ইমাম মোয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক মাওলানা নিজামুদ্দিন বিশ্বাসও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা ভারতের সংবিধান স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা। এখানে পাঠ্যক্রম বা কার্যপদ্ধতি নিয়ে লুকানোর কিছু নেই। প্রশাসন বা সরকার যে কোনো সময় এসে মাদ্রাসার পঠনপাঠন ও সার্বিক ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহের নামে পুলিশের অহেতুক হয়রানি বা অনিয়ম মানা হবে না। তবে বিডিও অফিস বা সঠিক প্রশাসনিক পদ্ধতি মেনে তথ্য চাওয়া হলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
অল ইন্ডিয়া ইমাম মুয়াজ্জিন অর্গানাইজেশনের নেতা মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক প্রশাসনকে সহযোগিতা করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জনসাধারণের আর্থিক সহযোগিতা ও অনুদানে পরিচালিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি মানুষের জাকাত, ফিতরা ও দানে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আনতেই এই উদ্যোগ।’
তবে তথ্য সংগ্রহের সময় পুলিশকে অযথা জটিলতা সৃষ্টি বা সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করার আহ্বানও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


