সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে বাগবিতণ্ডার জের ধরে এবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের তীব্র সমালোচনা করে তার বক্তব্যকে অপ্রাসঙ্গিক ও ‘আনবিকামিং’ বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ব্যারিস্টার খোকন অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল—হু ইজ হি হিয়ার!’ তিনি দাবি করেন, আইনজীবীদের স্বার্থ ও দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যস্থতা বা আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
নিজের দীর্ঘ নির্বাচনী অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা আমাকে ১১ বার বিভিন্ন পদে এবং সারা দেশের আইনজীবীরা বার কাউন্সিলে তিনবার নির্বাচিত করেছেন। ২০ বছর ধরে আমি ভোটে নির্বাচিত। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের কথা প্রধান বিচারপতিকে বলা আমারই দায়িত্ব।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি(কাজল) নিজেও একসময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন। অথচ তিনি এখন আইনজীবীদের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন! আই অ্যাম শকড অ্যান্ড সারপ্রাইজড।’
সংঘাতের নেপথ্যে ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনা
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৮ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের এজলাসে। এক আইনজীবীর ওপর আদালতের ধার্য করা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করাকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে ব্যারিস্টার খোকনের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ওই পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন এবং সেদিনের জন্য আদালতের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
এনিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে-প্রধান বিচারপতি একে ‘হালকা’ কথা হিসেবে নিয়েছেন।
কাজল আরও বলেন, অনেক সময় বিচারকক্ষে ভুল বোঝাবুঝি হয়। বিচারকগণ আইনজীবীদের বকাঝকাও করতে পারেন। এজলাসে বাগবিতণ্ডার ঘটনায় প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকেও আদালতের একটি স্বাভাবিক ভুল বোঝাবুঝি বা বিচারকদের বকাঝকার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
তবে বৃহস্পতিবার ব্যারিস্টার খোকন পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেলের সেসব বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেন।
বিচার বিভাগের দুর্নীতি ও নানা দাবি
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ব্যারিস্টার খোকন বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়েও কড়া বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্টে মামলার ফাইল তালিকাভুক্তকরণ, মামলার তদবির ও কতিপয় জুডিশিয়াল অফিসারের দুর্নীতিতে আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ। আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত বিচারপতিদের বিষয়ে তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্গঠন ও সক্রিয় করার দাবি তোলেন তিনি।
এক মাসের আলটিমেটাম
আদালত প্রাঙ্গণে কর্মচারীদের জন্য তৈরি আবাসনকে ‘বস্তি’র সাথে তুলনা করে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে তা উচ্ছেদের দাবি জানান ব্যারিস্টার খোকন। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের বসার ও চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, অথচ প্রাঙ্গণে বস্তি রয়েছে। আজ থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে বস্তি উচ্ছেদ করে আইনজীবীদের জন্য ভবন ও হলরুম তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।’ নির্ধারিত সময়ে ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ আইনজীবীরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
পাশাপাশি, বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে আপিল বিভাগে অন্তত তিনটি বেঞ্চ গঠন এবং প্রয়োজনীয় নতুন বিচারপতি নিয়োগের দাবিও জানান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি।


