চট্টগ্রামে অবস্থিত জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সে পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধনের সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ান সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানান।
এ সময় তিনি নাগরিকদের প্রতি পরিচ্ছন্নতাকে শুধু মাঝে মাঝে পরিচালিত অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সরকারি সংস্থা বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টায় পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান একা কখনো একটি শহরের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও বসবাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিককে বুঝতে হবে এবং এ বিষয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব নিতে হবে।’
জেলা প্রশাসনের চলমান উদ্যোগ ‘পরিচ্ছন্ন শহর ও গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’-এর আওতায় চট্টগ্রামে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

জাহিদুল ইসলাম জানান, গত ২৫ জুলাই থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রথম দিন সরকারি দপ্তরের ছয় হাজার ২২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে অংশ নেন। তারা বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ের ছাদ ও প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ১৩৫ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেন।
পরবর্তী সময়ে জেলার বিভিন্ন পুকুর ও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও একই ধরনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা চাই না এটি কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সময়ের কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকুক। আমরা চাই পরিচ্ছন্নতা একটি অভ্যাসে পরিণত হোক। একবার এটি অভ্যাসে পরিণত হলে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দিন বা অভিযানের অপেক্ষা না করে নিজেরাই নিজেদের আশপাশ পরিষ্কার রাখবে।’
শনিবার জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সের পাশাপাশি চট্টগ্রামের চান্দগাঁও ও পটিয়ার কয়েকটি পুকুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পর্যায়ক্রমে সারা বছরজুড়ে এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা হবে বলে জানান তিনি।
জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা
জেলা প্রশাসক ১৬ দশমিক ৩৮ একর আয়তনের জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান।
‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এই কমপ্লেক্সে জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, কান্তজিউ মন্দির, কার্জন হল ও আহসান মঞ্জিলসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার প্রতিকৃতি রয়েছে।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যারা বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চান, তারা এই স্থানটি পরিদর্শনের মাধ্যমে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। কালুরঘাটের নিকটবর্তী হওয়ায় জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সটির বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। এ এলাকার সঙ্গে মানুষের আবেগ ও আগ্রহ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।’
জেলা প্রশাসন কমপ্লেক্সটিকে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত বিনোদন ও শিক্ষামূলক স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বলে জানান তিনি।
গত কয়েক বছরে কমপ্লেক্সের ভেতরের বেশ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর সংস্কার এবং কমপ্লেক্সটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জেলা প্রশাসন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসন পুরো কমপ্লেক্স পরিষ্কার করা এবং দর্শনার্থীদের জন্য এর পরিবেশ আরও সুন্দর করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই মানুষ এখানে এসে নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে সময় কাটাক এবং আমাদের দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানুক। একই সঙ্গে আমরা চাই, পরবর্তী প্রজন্ম একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠুক এবং দক্ষ ও সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক।’

বৃহত্তর সৌন্দর্যবর্ধন উদ্যোগ
জাহিদুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের নান্দনিকতা বাড়াতে জেলা প্রশাসন আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ চলছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে আরও বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘দেশ ও পরিবেশ পরিষ্কার রাখাই যথেষ্ট নয়; আমাদের মনকেও পরিষ্কার রাখতে হবে।’ এ সময় তিনি নাগরিকদের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতা অভিযানে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
জেলা প্রশাসন নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার এবং পরিচ্ছন্নতাকে একটি ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে।


