ঢাকার অভিজাত বনানী-গুলশান এলাকার খুব কাছেই কড়াইল বস্তি। চারপাশে সুউচ্চ ভবন, মাঝে টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি ছোট ছোট অসংখ্য ঘরের সারি। বনানী লেকের পাড় ঘেঁষে সরু কাঠ ও বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এসব টিনশেড ঘরেই বসবাস করছেন হাজারও মানুষ। দূষিত লেকের পানি এবং লেকপাড়ে বর্জ্যের স্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া অসহনীয় দুর্গন্ধই তাদের নিত্যসঙ্গী।
১৯৯০-এর দশকে তিনটি সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন প্রায় ৯৩ একর জমি দখলের মাধ্যমে কড়াইল বস্তির বিস্তার শুরু হয়। বর্তমানে এটি রাজধানীর অন্যতম বড় বস্তি। এখানে আনুমানিক ৪০ হাজার ঘর রয়েছে, যেখানে বসবাস করেন কয়েক লাখ নিম্নআয়ের মানুষ।

ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইলের বাসিন্দাদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাসিন্দাদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা কষ্টে আছেন। আবাসনের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আমরা ধীরে ধীরে সেই সমস্যা সমাধান করতে চাই।’
তবে প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তবতা এখনো অনেক দূরে।
কড়াইলের শিশুরা বেড়ে উঠছে বিষাক্ত এক পরিবেশে। অনেক শিশুকে খালি পায়ে ও গায়ে জামা ছাড়াই টিনের ছাদ ও বালুর বস্তার ওপর খেলতে দেখা যায়। তাদের চারপাশে পড়ে থাকে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ ও পচা আবর্জনা।
কাছের জলাশয়ের পানি সবুজাভ, দুর্গন্ধযুক্ত এবং ভাসমান বর্জ্যে পরিপূর্ণ। এই দূষিত পরিবেশ শুধু কড়াইলের শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়, পাশাপাশি যে জলাশয়ের পাশে তারা বেড়ে উঠছে, সেই লেকের জীববৈচিত্র্যকেও ধ্বংস করছে।

বনানী লেক নিজেই এখন হুমকির মুখে থাকা জলজ বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দূষণের কারণে লেকের মাছ, জলজ প্রাণী, উদ্ভিদসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।
২০২৪ সালে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চের একটি গবেষণায় বলা হয়, বনানী লেকের অবস্থা ‘অতিরিক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ’ (শেওলা ও জৈব পদার্থে অতিরিক্ত ভারী হয়ে পড়া) জলাশয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণায় লেকের ট্রফিক স্টেট ইন্ডেক্স (টিএসআই) বা পুষ্টি সূচক ৮৪ দশমিক ১ থেকে ৯৭ দশমিক ৭-এর মধ্যে পাওয়া যায়, যা ভয়াবহ পরিবেশগত অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণা চলাকালে লেকের পানির মান নিম্নমানের বা অত্যন্ত নিম্নমানের দেখা যায় বলেও উল্লেখ করে সাময়িকীটি। সেই দূষণের ক্ষতি এরইমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, দূষণের কারণে বনানী লেকে প্রতিদিন ১০০টির বেশি মাছ মারা যাচ্ছিল।

পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন কড়াইল ও বনানী লেকের দূষিত পানিকে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং লেকের জৈবিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বনানী লেকের পরিবেশগত গুরুত্ব অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০১ সালে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেককে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়।
তবু দূষণ থামেনি। পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য, গৃহস্থালি ও নির্মাণ বর্জ্য, অবৈধ দখল এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে লেকটি।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের আশপাশের তিন হাজার ৮৩০টি ভবনের মধ্যে দুই হাজার ২৬৫টির পয়োনিষ্কাশন সংযোগ সরাসরি জলাশয়ের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ ভবনের বর্জ্য সরাসরি লেকের পানিতে পড়ছে।

তবে কড়াইলের মানুষের কাছে এই পরিবেশগত বিপর্যয় কোনো দূরের বিষয় নয়। তারা সরাসরি দূষিত জলাশয়ের পাশে বসবাস করছেন। তাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে এমন এক পরিবেশে, যে পরিবেশের ধ্বংস তারা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখছে।
আর সেই শিশুদের জন্য? উন্নত জীবনের স্বপ্ন এখনো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে বহুতল ভবনের মতোই অধরা। বনানী লেক যখন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এর পাড়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের সুস্থ পরিবেশে বড় হওয়ার সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়ে আসছে।


