জামায়াতের দ্বিচারিতা: রাষ্ট্র সংস্কারে সোচ্চার, দল সংস্কারে ‘না’

জামায়াতের দ্বিচারিতা: রাষ্ট্র সংস্কারে সোচ্চার, দল সংস্কারে ‘না’
Advertisement
Advertisement

রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সোচ্চার দল জামায়াতে ইসলামী। তবে জামায়াত তার অভ্যন্তরীণ সংস্কার করতে না চাওয়ায় কতটা কট্টর, তা দলের সাবেক নেতা আবদুর রাজ্জাকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্টোরি অ্যান্ড পলিটিকস’ এর পরতে পরতে উঠে এসেছে।

তিন দশকের চেষ্টায় জামায়াতকে সংস্কার করতে রাজি করাতে না পেরে এক পর্যায়ে দলটি ছেড়ে যাওয়া এই নেতা লিখেছেন, “জামায়াতে সংস্কার একটি ‘নিষিদ্ধ এলাকা’।”

বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। এতে ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেওয়ার পর জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াতে রাজি করতে বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ চেষ্টার কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি অন্যান্য সংস্কারের চেষ্টা কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তাও রয়েছে।

রাজ্জাকের ভাষ্য, তিনি একা নন, মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দঁড়িতে ঝোলা মীর কাসেম আলী ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকেও ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়েছে, অপমান-অপদস্থও করা হয়েছে।

জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব অবশ্য এই বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না। দলের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, তাদের দলের সব সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে হয়। কাজেই কোনো ব্যক্তির প্রস্তাব থাকলেও তা দলের অন্যরা অনুমোদন না করলে সেটিই গণতন্ত্র।

রাজ্জাককে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটু ভিন্ন চোখে দেখা হতো। সুপ্রিম কোর্টের আইন পেশার পাশাপাশি সুটেড-বুটেড ও স্মার্ট করে কাটা চাপ দাঁড়ির এই নেতাকে দলের অন্য নেতাদের ভিড়েও আলাদাভাবেই চোখে পড়ত।

১৯৯২ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা শুরুর পর ধীরে ধীরে দলে তার অবস্থান পোক্ত হয় এবং এক পর্যায়ে তিনি দলটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেন, পাশাপাশি আইনি দিকও দেখভাল করতে থাকেন।

২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের অন্যতম প্রধান আইনজীবী ছিলেন রাজ্জাক। তবে দলের ভেতরে মতভেদের এক পর্যায়ে তিনি ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর দেশ ছেড়ে চলে যান, জামায়াত থেকেও পদত্যাগ করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজ্জাক দেশে ফেরেন। পরের বছর ৪ মে তিনি মারা যান।

একাত্তরের প্রশ্নে সংস্কারের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ

রাজ্জাক লেখেন, তার প্রাথমিক সংস্কার এজেন্ডা ছিল ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা স্পষ্ট করা।
“শুরু থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীতে জামায়াতকে তার ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে এবং অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে”, লেখেন তিনি।

১৯৯০ সালের মার্চ মাসে চীনের বেইজিংয়ে একটি আইন সম্মেলনে পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি নাসিম হাসান শাহ তাকে ১৯৭১ সালে জামায়াতের অবস্থান সঠিকভাবে ব্যাখ্যা ও সমাধান করার পরামর্শ দেন। এই পর্যবেক্ষণ দেশে ফিরে দলীয় সহকর্মীদের বলেন। কিন্তু বেশিরভাগেই এতে রাজি হননি।

গোলাম আযম নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর তাকে ক্ষমা চাইতে রাজি করানো হয়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।

২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে একাত্তরের আলবদর নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ মন্ত্রী হওয়ার পরও চেষ্টা করেন রাজ্জাক।

সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক—আফতাব আহমেদ, এম মাহবুবউল্লাহ এবং আবদুর রবকে নিয়ে একটি খসড়া প্রস্তুত হয়। জামায়াতের শীর্ষ বৈঠকে সেটি অনুমোদনও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজামী কোনো এক ‘মুরুব্বি’র পরামর্শে সিদ্ধান্ত পাল্টান। তিনি কৌশল করে সেটি কর্ম পরিষদে তোলার কথা বলেন। সময়ক্ষেপণ করে ২০০৫ সালের অক্টোবরে খসড়াটি কর্ম পরিষদ প্রত্যাখ্যান করে।

সেই বৈঠকে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা যদি ক্ষমা চাই, তবে পাকিস্তান আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবে।’

আরও পড়ুন

২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসির পর ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের সহায়তায় রাজ্জাক আরও একটি খসড়া তৈরি করেন। ওই বছরের ২১ নভেম্বর নতুন আমির মকবুল আহমাদকে একটি চিঠি লেখেন। কিন্তু কাজ হয়নি।

রাজ্জাক লেখেন, ‘আবারও নেপথ্যের শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিবারই ক্ষমা প্রার্থনার উদ্যোগ নেওয়া হলে জামায়াতের ভেতরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তা আটকে দেন।’

অন্য সংস্কারও হয়নি

রাজ্জাক জানান, ২০০৩ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হওয়ার পর তার লক্ষ্য ছিল জামায়াতের ভেতরে সংস্কার আনা, এর কর্মসূচিতে আধুনিকতা আনা এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।

১৯৯৪ সালের এক কর্মশালায় তিনি প্রস্তাব করেন, নারীদের শুরায় পূর্ণ সদস্যপদ দিতে হবে এবং নিকাব ছাড়া কেবল হিজাব পরিহিত নারীদেরও রুকন হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

১৯৯০ সালেও নাগরিক সমাজ ও এলিটদের জামায়াতে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন রাজ্জাক, যা প্রশংসা পেলেও বাস্তবায়িত হয়নি।

২০০৭ সালের নভেম্বরে লন্ডনে এক সেমিনারে রাজ্জাক জামায়াতে বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয় ও স্থবিরতা নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রশ্ন তোলেন পশ্চিমা পোশাক পরা ও দাড়ি কামানো পুরুষরা রুকন হতে পারলে নিকাব না পরা সত্ত্বেও হিজাব পরা নারী রুকন হতে পারেন না কেন।

নিজামী তার বক্তব্য শুনে অসন্তুষ্ট হন। পরবর্তী বছরগুলোতে রাজ্জাককে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০০৭ সালে নভেম্বরের পাকিস্তানের এক প্রখ্যাত জামায়াত নেতা নিজামীকে পরামর্শ দেন, বাংলাদেশে নতুন নামে ইসলামী আন্দোলনকে পুনর্গঠন করা উচিত। নিজামী তাতেও সাড়া দেননি।

২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় আরব বসন্ত নিয়ে একটি প্রবন্ধে পরোক্ষভাবে জামায়াতের সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।

এরপর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব তীব্র অসন্তোষ জানায়। সামাজিক মাধ্যমে, বিশেষ করে সোনার বাংলা ব্লগে জামায়াত সমর্থকরা রাজ্জাককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কাদের মোল্লার ফাঁসির পর রাজ্জাক লন্ডনে যান। সেখানে তুরস্কের এ কে পার্টি, টিউনিশিয়ার এন্নাহদা এবং মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন। মরক্কো মডেল তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ভারপ্রাপ্ত আমিরকে ১৯ পৃষ্ঠার একটি চিঠি দেন তিনি, যেখানে মরক্কো মডেল অনুসরণের পরামর্শ দেন। চিঠিটি লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে পড়া হয়, চিঠির জবাব দেওয়া হয়নি!

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দঁড়িতে ঝোলা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ২০১০ সালের নভেম্বরে কারাগার থেকে ৩৬ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে জামায়াত বিলুপ্ত করে নতুন দল গঠনের পরামর্শ দেন। তাকেও ‘সংস্কারবাদী’ আখ্যা দিয়ে চিঠিটি চেপে যাওয়া হয়।

১৯৯৮ সালেও শাহ আবদুল হালিমসহ অনেকেই নতুন দলের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে মীর কাসেম আলী একটি রুদ্ধদ্বার কর্মশালার আয়োজন করেন, যেখানে জামায়াতকে কেবল দাওয়াহ সংস্থায় রূপান্তর করে একটি মধ্যপন্থী-ডানপন্থী নতুন দল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই উদ্যোগের জন্য জামায়াত নেতৃত্ব মীর কাসেম আলীকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন।

লন্ডনে অবস্থানরত জামায়াতের বহু শিক্ষিত শুভানুধ্যায়ী জামায়াতকে আধুনিক করার জন্য ২০০২, ২০০৭ এবং ২০১০ সালে একাধিক সেমিনার ও গবেষণা প্রস্তাব জমা দেন, কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়।

২০১৯ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার গুজব ওঠে। চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকে ১৯৭১ সালের ইস্যুর সমাধান করা, দল বিলুপ্ত করা ও নতুন দল গঠনের বিষয়ে আলোচনা করে।

তখনো রাজ্জাক ক্ষমা প্রার্থনার খসড়া ও দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরি করে দেন। শুরা সদস্যদের অধিকাংশ দল বিলুপ্তিতে রাজি হলেও এক-তৃতীয়াংশ ক্ষমা প্রার্থনায় সম্মতি দেন।

তবে আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিলটি মন্ত্রিসভায় পেশ না করতেই জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ ইউ টার্ন নেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাও হবে না, দল বিলুপ্তিও হবে না।

রাজ্জাক লেখেন, ‘জামায়াত নেতৃত্ব প্রমাণের অভাব রেখে দেখিয়ে দিল যে, বাইরের প্রচণ্ড চাপ ছাড়া তারা নিজেরা ভেতরে কোনো দিন সংস্কার করবে না।’

সংস্কার প্রশ্নে এই অনমনীয়তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘মোটেও না। আমরা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নানা রাজনৈতিক সংস্কার করে আসছি।’

গত এক দশক বা দুই দশকে বড় কী সংস্কার করা হয়েছে যদি বলতেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারেননি তিনি। বলেন, ‘ওয়েবসাইটে গেলেই দেখবেন। কেবল ১০ বছরে না, ১৯৭১ সাল থেকে অনেক মৌলিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা করছি। দল পরিচালনার বিষয়ে আমাদের মূল নীতি হলো অধিকাংশের মতকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

দলটির সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘জামায়াতে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা, নিয়মিত পরিকল্পনা হয়। সেটি পাঁচ বছরেরও হয়, ৩০ বছরেরও হয়। এটা মানেই সংস্কার।’

ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে সংস্কারে নারাজির বিষয়টি তুলে ধরেছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘কারও ব্যক্তিগত মত দলের সিদ্ধান্ত হবে না।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad