জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। দেশটিতে দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা সংকটের মধ্যে দীর্ঘায়ুর নতুন এই মাইলফলকের তথ্য পাওয়া গেল।
জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে আল জাজিরার খবরে বলা হয়, এ বছর দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা রেকর্ড এক লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের তুলনায় এ সংখ্যা সাত হাজার ৯১৪ জন বেড়েছে। এ নিয়ে টানা ৫৬ বছর জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ল। ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী জাপানিদেড় প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনইচিরো উয়েনো বলেন, ‘অনেক মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছেন- এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।’ চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে গভীর জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, অন্যদিকে শিশুজন্ম নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে এবং তাদের ওপর পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবীণদের পরিচর্যার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বহনের চাপ বাড়ছে।
জাপানে দ্রুত বাড়ছে বার্ধক্য
পরিসংখ্যান বলছে, জাপান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশগুলোর একটি। বর্তমানে দেশটির প্রায় প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে তিনজনের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৭০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জাপানে ৯৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল আট লাখের বেশি। বিপরীতে, একই সময়ে দেশটিতে জন্ম নিয়েছে কেবল সাত লাখ শিশু।
ফলে জাপানের মোট জনসংখ্যাও ক্রমশ দ্রুত কমছে। প্রাথমিক আদমশুমারির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশটির ৪৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে ৪৫টিতেই জনসংখ্যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় কমেছে। কেবল রাজধানী টোকিও ও ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা বেড়েছে।
২০০৮ সালে জাপানের জনসংখ্যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছিল। দেশটির জাতীয় জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধারণা করছে, ২০৭০ সালের মধ্যে তা কমে আট কোটি ৭০ লাখে নেমে আসবে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
শতবর্ষীদের দীর্ঘায়ুর রহস্য কী
জাপানে এত বেশি মানুষ কেন ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকছেন, তার একক কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে গবেষকেরা খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা- এই তিনটির সমন্বয়কে দীর্ঘায়ুর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসে মাছ, শাকসবজি ও ভাতের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি এবং সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ কম। পশ্চিমা অনেক দেশের তুলনায় জাপানে স্থূলতার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রতিদিনের জীবনযাত্রাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। বয়স্ক মানুষসহ জাপানের বহু মানুষ নিয়মিত হাঁটেন, সাইকেল চালান এবং গণপরিবহন ব্যবহার করেন। দলবদ্ধভাবে শরীরচর্চার প্রচলনও দেশটিতে বেশ বিস্তৃত।
জাপানের সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থাও তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার সুযোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশের তুলনায় জাপানে মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি।
দীর্ঘায়ুই কেন জাপানের সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘায়ু এবং মৃত্যু হার কমে যাওয়া একটি দেশের জন্য অন্যতম অর্জন এবং সফলতা হলেও জাপানের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন জন্মহার। ২০২৫ সালে দেশটির মোট প্রজনন হার, অর্থাৎ একজন নারী তার জীবদ্দশায় গড়ে যতটি সন্তান জন্ম দেবেন বলে ধারণা করা হয়, তা রেকর্ড সর্বনিম্ন ১ দশমিক ১৪ এ নেমে আসে। অভিবাসনের মাধ্যমে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা না বাড়ালে সাধারণত একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে এই হার কমপক্ষে ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন বলে ধরা হয়।
একটি জনগোষ্ঠী বয়স্ক হয়ে উঠলে পেনশনভোগী মানুষের সংখ্যা বাড়ে। একই সঙ্গে তাদের অনেকের জন্য বেশি সামাজিক পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাদের সহায়তায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যদি কমতে থাকে, তবে সময়ের সঙ্গে এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়।
সন্তান নিতে মানুষকে উৎসাহিত করতে জাপান সরকার এরইমধ্যে শিশু ভাতা, ভর্তুকিযুক্ত শিশু পরিচর্যা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটিসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা চালু করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো দীর্ঘমেয়াদি জন্মহার পতনের প্রবণতা বদলাতে পারেনি।
সামাজিক বিজ্ঞানীদের মতে, জাপানে আগের তুলনায় কম মানুষ বিয়ে করছেন। আবার যারা বিয়ে করছেন, তাদের অনেকেই বেশি বয়সে বিয়ে করছেন, যখন সন্তান ধারণের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তা, দীর্ঘদিন ধরে মজুরি স্থবির থাকা এবং কঠিন কর্মঘণ্টা নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে তাদের জন্য পরিবার গঠন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও শিশু পরিচর্যা ও গৃহস্থালির দায়িত্ব নারী-পুরুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়নি। ফলে নারীদের জন্য পেশাজীবন ও মাতৃত্ব একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
জাপানের অর্থনীতিতে বার্ধক্যের প্রভাব
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জনসংখ্যা হ্রাস ও কমতে থাকা জন্মহারকে দেশের বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জাপানি কর্মকর্তারাও বারবার সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার অর্থ হলো- আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অর্থ দেওয়া মানুষের সংখ্যাও কমে যাওয়া। একই সময়ে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রবীণদের পরিচর্যায় ব্যয় বাড়ছে। এই ভারসাম্যহীনতা সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আয়করের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার অন্যতম হাতিয়ার তরুণ কর্মীদের ওপরও চাপ বাড়ছে।
নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর। তরুণেরা শহরমুখী হওয়ায় অনেক এলাকায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মীর সংখ্যা কমছে এবং সরকারি সেবাও সংকুচিত হচ্ছে।
অভিবাসন শ্রমিক সংকট কিছুটা কমাতে পারে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে বিদেশিরা এখনো দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি।
এই সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আরও বেশি অভিবাসী গ্রহণের প্রস্তাব জাপানের রাজনীতিতে এখনো বিতর্কিত বিষয়।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোর চিত্র কী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মানবজাতির অন্যতম বড় অর্জন। সংস্থাটি বলেছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের অগ্রগতি মৃত্যুহার কমিয়েছে, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের মধ্যে। এখন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ৬০ বছর কিংবা তার বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে গড় আয়ু ৭৩ দশমিক ৩ বছরে পৌঁছেছে, যা ১৯৯৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ বছর বেশি। ২০২৩ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল ১১০ কোটি। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১৪০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জনসংখ্যার বার্ধক্যের এই পরিবর্তন সব দেশে একই গতিতে হচ্ছে না। জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা পূর্বাভাসের সবশেষ ঐতিহাসিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাপানের মানুষের মধ্যম বয়স ছিল ৪৯ বছর। অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে মধ্যম বয়স ছিল ৪৭ দশমিক ৫ বছর, পর্তুগালে ৪৬ দশমিক ২ বছর, গ্রিসে ৪৫ দশমিক ৭ বছর এবং জার্মানিতে ৪৫ দশমিক ১ বছর।


