এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর একের পর এক অভিযান মোকাবিলা করেও টিকে আছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী হুথি গোষ্ঠী।
দেশটির সৌদি সমর্থিত সরকারের সঙ্গে বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধে জড়িত ইরান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সম্প্রতি লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করেও তারা হামলা চালাচ্ছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তার করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শঙ্কা উস্কে দিচ্ছে হুথিরা। বিদোহী গোষ্ঠীটির ক্রমবর্ধমান শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের গতিপথও বদলে দিচ্ছে।
হুথিদের উত্থানের বড় ধাপটি শুরু হয় ২০১৫ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বড় অংশ দখল করে নেয়।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে ওই বছরই সামরিক হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। এরপর কয়েক বছর ধরে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে দেশটি।
এসব অভিযানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও তথাকথিত বিদ্রোহীদের ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি।
ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূখণ্ড হুতিদের বড় সুবিধা দিয়েছে। এ ধরনের এলাকায় যোদ্ধাদের পাশাপাশি সামরিক অবকাঠামোও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
হুতিদের সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে গোষ্ঠীটির যোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। ২০২৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে আনুমানিক তিন লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়।
ইরান হুথিদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। তবে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে গোষ্ঠীটিকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তেহরান।
ইয়েমেনগামী বিভিন্ন চালান থেকে বারবার ইরানে তৈরি অথবা ইরানি নকশা থেকে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আটক করা হয়েছে।
সশস্ত্র গোষ্ঠীটির হাতে এখন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম।
২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনের অভ্যন্তরে লড়াই অনেকটাই থেমে যায়।
তবে ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি ছিল, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকর করতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
এর জবাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে হুথিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই সামরিক অভিযান আরও জোরদার করে। সে সময় এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় দুই হাজার গোলাবারুদ ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের শুধু গোলাবারুদের পেছনেই ৭৫ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়। অন্যদিকে হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস করে।
শেষ পর্যন্ত এই সামরিক অভিযানের পর হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়। তবে তারা ইসরায়েলে হামলা চালানো অব্যাহত রাখে।
পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় হুথি নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। সে সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দরেও হামলা চালায় ইসরায়েল।
গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমদিকে হুথিরা সংঘাতের বাইরে ছিল। তবে জুলাইয়ে তারা সৌদি আরবে হামলার মাধ্যমে নতুন করে সংঘাতে জড়ায় এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে।
অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে হুথিবিরোধী শক্তিগুলো এখনো বিভক্ত। সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে।
সৌদি আরব নতুন করে স্থলযুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহী। একই সময়ে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ইরানের দিকে থাকায় সংঘাত বন্ধের আলোচনায় বসতে হুথিদের ওপর তেমন চাপ নেই। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্তে এখনো অটল বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। তাদের এই দাবি এখনো সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে আছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।


