দিনাজপুরের একসময়ের জমজমাট হাসকিং মিল বা ছোট চালকল শিল্প এখন সংকটে পড়েছে।
শ্রমিকসংকট, পুঁজির অভাব, চড়া সুদ, করপোরেট অটো রাইস মিলের প্রতিযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবর্তিত সরকারি নীতিমালার চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শ্রমঘন শিল্পটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এতে অনেক মিলমালিক যেমন ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন, তেমনি কাজ হারিয়েছেন এ খাতের শ্রমিকেরা।
জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দিনাজপুরে দুই হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চালু থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০৩টিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে অটো রাইস মিলের সংখ্যাও ৩৪৬টি থেকে কমে ২২৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
অনেক মিলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো মিল গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ চাতালের ব্যবহার পরিবর্তন করে ভুট্টা শুকানো বা গোখাদ্যের তুষ তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১০ সালের পর দেশে অটো রাইস মিলের সংখ্যা ও বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। একটি অটো রাইস মিলের উৎপাদনক্ষমতা একাধিক হাসকিং মিলের সমান। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে উৎপাদিত চকচকে চালের চাহিদাও বাজারে বেশি। বিপরীতে হাসকিং মিলে উৎপাদিত চাল কিছুটা খসখসে ও লালচে হওয়ায় ভোক্তাদের একটি বড় অংশের কাছে এর চাহিদা কমছে।
বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও অটো রাইস মিলের এজেন্টরা কৃষকদের আগাম অর্থ দিয়ে ধান সংগ্রহ করায় হাসকিং মিলগুলো পর্যাপ্ত ধান কিনতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র শ্রমিকসংকট। ধান সেদ্ধ, শুকানো ও ভাঙানোর কাজ শ্রমিকনির্ভর হওয়ায় শ্রমিক না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজের সংকট ও তুলনামূলক বেশি আয়ের আশায় অনেক শ্রমিকও অটোরিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
মিলমালিকদের মতে, একসময় সহজলভ্য কৃষিঋণ ও তুলনামূলক কম সুদের সুবিধা থাকলেও বর্তমানে ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। এতে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে মূলধন হারিয়েছেন এবং ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন।
এদিকে সরকারি চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শর্ত ও মানদণ্ড পূরণ করতে গিয়ে ছোট মিলগুলো সমস্যায় পড়ছে। ভাঙা দানার হার ও চালের বাহ্যিক চকচকে ভাবের মতো বিষয়গুলো নির্ধারিত মান অনুযায়ী নিশ্চিত করা ছোট মিলগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার উপযুক্ত যন্ত্রপাতির অভাব এবং চাল দৃশ্যত চকচকে না হওয়ায় অনেক সময় এসব মিল সরকারি সংগ্রহের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বাজারে ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত চকচকে চালের প্রতি আগ্রহ বাড়লেও পুষ্টিবিদদের মতে, হাসকিং মিলে উৎপাদিত লালচে চালে তুলনামূলক বেশি খনিজ ও পুষ্টি উপাদান থাকে। অতিরিক্ত পালিশ করা চাল দীর্ঘদিন খেলে পুষ্টিগুণের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু হাসকিং মিলের মালিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। সচেতন কিছু ক্রেতার কাছে এখনো এ চালের চাহিদা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নীতিমালার সংস্কার, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং ভোক্তাদের মধ্যে চালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।


