নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসলেই ইশতেহারের গল্প বেশ জমে ওঠে। ইশতেহার মূলত জনগনের জন্য রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতা বা দলের ওয়াদা সাধারণ মানুষ এখন বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ, নির্বাচনের পরে এই ইশতেহারের আলোচনা আর থাকে না। তখন নেতাদের কাছে সাধারণ মানুষের আর কোনো মূল্য থাকে না। কিন্তু হওয়ার কথা উল্টা। নির্বাচনের আগেও যেমন নেতারা সাধারণ মানুষের কাছে যাবে, তেমনি সরকার গঠনের পরেও মানুষের কথা শুনতে তাদের কাছে যাওয়া দরকার।
ইশতেহারের মোহনীয় শব্দমালা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে কিছু সাধারণ শব্দমালা পাওয়া যায়। যেমন–‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’, ‘দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালে আনা’, ‘বেকারত্ব দূরীকরণ’, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ এবং ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা’। গত কয়েক দশকের ইশতেহারগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে শব্দগুলোর খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এর কারণ কী? কারণ হলো, যে সমস্যাগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি দল ক্ষমতায় আসে; পাঁচ বছর পর সেই একই সমস্যাগুলো আরও ঘনীভূত হয়। ফলে পরবর্তী নির্বাচনেও ওই একই প্রতিশ্রুতি দিতে হয়।
একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার হওয়া উচিত তাদের দর্শনের প্রতিফলন এবং আগামী পাঁচ বছরের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের দেশে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক বিপণন বা মার্কেটিং টুল। ভোটারদের মন জয় করার জন্য এমন সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যার অর্থনৈতিক বা কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে দলগুলোর নিজেদেরই কোনো স্পষ্ট ধারণা থাকে না।
মুদ্রার উল্টো পিঠ: বাস্তবায়নের করুণ চিত্র
ইশতেহারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। একটি দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকারের তালিকা আমূল বদলে যায়। ইশতেহারে বলা হয় ‘দল-মত নির্বিশেষে সবার উন্নয়ন’, কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো ‘দলীয়করণের চরম উৎসব’। একই সঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে থাকে না কোনো নীতিগত সিধান্ত। এমনকি বাস্তবায়ন হবে না জেনেই অনেক দল আকর্ষনীয় শব্দমালা ব্যবহার করে থাকে। সরকার গঠনের পর তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হলো তার কোনো আপডেট তথ্য পাওয়া যায় না।
কেন এই ব্যবধান?
ইশতেহার বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের দেশে ইশতেহার তৈরির প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের মানুষের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে কয়েকজন তাত্ত্বিক নেতা বা বিশেষজ্ঞ মিলে এটি তৈরি করেন। ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি সেখানে থাকে না।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অভাব। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কোনো দলের নিবন্ধন বাতিল হয় না বা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি দলগুলোকে গালভরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে উৎসাহিত করে। ভোটাররাও ইশতেহার পড়ে ভোট দেন–এমন উদাহরণ আমাদের দেশে বিরল। এখানে ভোট দেওয়া হয় মূলত আবেগ, দলীয় আনুগত্য বা নগদ প্রাপ্তির আশায়।
তারুণ্যের ইশতেহার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে ইশতেহারের প্রাসঙ্গিকতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের বড় একটি অংশ তরুণ ভোটার। তারা এখন আর পুরোনো রাজনীতির ঘুণে ধরা বুলি শুনতে প্রস্তুত নয়। তরুণদের দাবি সুনির্দিষ্ট-মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র।
এখন যদি কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের পর ‘স্মার্ট’বা ‘সংস্কার’ শব্দ ব্যবহার করে আবারও পুরোনো পথে হাঁটে, তবে তাদের চরম মাশুল দিতে হবে। এবারের পরিবর্তন আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষ এখন আর ইশতেহারের মলাট দেখে ভোলে না, তারা চায় কাজের প্রমাণ।
উত্তরণের পথ কী?
ইশতেহারকে কেবল এক টুকরো কাগজ থেকে বাস্তবতায় রূপান্তর করতে হলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
১. স্বাধীন কমিশন গঠন: একটি স্বাধীন কমিশন থাকতে পারে যা প্রতি বছর সরকারি দলের ইশতেহার কতটুকু বাস্তবায়িত হলো তার ‘পারফরম্যান্স অডিট’ করবে।
২. বাজেটের সঙ্গে সমন্বয়: নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বার্ষিক বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে।
৩. জনগণের সচেতনতা: ভোটারদের প্রশ্ন করতে শিখতে হবে–’গতবার যা বলেছিলেন, তার কতটুকু করেছেন?’
পরিশেষে বলা যায়, ইশতেহার হওয়া উচিত একটি পবিত্র চুক্তি। ভোটার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার এই চুক্তিতে যখন একপক্ষ ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন রাজনীতির ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যায়। আর রাজনীতি যখন আস্থা হারায়, তখন সেখানে উগ্রবাদ বা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটে। আমরা চাই না আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার কেবল লাইব্রেরির কোনায় ধুলো জমা কোনো দলিলে পরিণত হোক। জনগণ আর রাজনৈতিক দলের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করুক ইশতেহার।


