যে পোকাটাকে আমরা বাড়িতে দেখলেই ঝাঁটা হাতে তাড়া করি, বিরক্তিকর কিংবা ক্ষতিকর মনে করি, সেই তেলাপোকাই যে কখনো পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে–তা কে ভেবেছিল? কিন্তু তরুণ সমাজ যখন একজোট হয়, তখন ছোট একটা প্রতীকও যে কী বিশাল শক্তি হয়ে উঠতে পারে, এটি তারই এক উদাহরণ।
ভারতের কথাই ধরুন। ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা জনতা দল’ (সিজেপি)–যা কয়েকজন তরুণের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে সেই আন্দোলন এক বিশাল সামাজিক মঞ্চে রূপ নিল। তাদের দাবি–শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। আর এই দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত গদি হারালেন এক মন্ত্রী।
সংবাদপত্রের খবর অনুয়ায়ী, ভারতে তরুণদের খোঁচা দিতে তাদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এক বিচারপতি। তরুণরা সেই কটাক্ষকে নিজেদের পরিচয় আর আন্দোলনের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলল।
ঠিক এমন একটা ব্যাপার আমরা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশেও দেখেছিলাম। ‘রাজাকার’ শব্দটি অত্যন্ত অবিবেচকের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল, আর তরুণরা সেটাকেই তাদের আন্দোলনের প্রধান স্লোগান বানিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল।
সেই আন্দোলনের পরিণতি তো আমাদের সবার জানা। সামান্য কিছু সংস্কারের দাবি দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় পুরো ব্যবস্থা বদলের ডাক হয়ে উঠল, তাতে বিদায় নিল কোণঠাসা হয়ে পড়া সরকার।
আজ সারা বিশ্বেই তরুণেরা নিজেদের দাবির ব্যাপারে স্পষ্ট ও সরব। ভারতের ঘটনা আমাদের আবার দেখাল যে, ইন্টারনেটে শুরু হওয়া একটা ছোট্ট মজার বিষয় কীভাবে চোখের পলকে গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই আন্দোলন মনে রাখার মতো হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক খবরে দেখা গেছে, ছোট ছোট সন্তানের মা-বাবারাও এই তরুণদের সমর্থনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বেশ কয়েকজন তরুণী মা বলছিলেন, তাদের সন্তানরা এখনো খুব ছোট। কিন্তু ওরা বড় হয়ে যেন একটা সুন্দর ও ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা পায়–সেই ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে তারা প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন।
বাংলাদেশের ঘটনার সঙ্গে এই জায়গাতেও অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে যখন ঢাকার শাহবাগে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়, তখন অনেকে হেসেছিলেন। ভেবেছিলেন, দুই দিন পর এটা এমনিতেই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সেই হিসাব-নিকাশ কতটা ভুল আর ভুল ছিল, তা তো ইতিহাসই প্রমাণ করেছে।
তবে বাংলাদেশ আর ভারতের এই দুটি ঘটনার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। ভারতে সরকার পরিস্থিতি বুঝে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মেনে নিয়েছে।
আমাদের আন্দোলনের শুরুর দুই সপ্তাহের কথা যদি ভাবি–তখন কিন্তু দাবি ছিল শুধু সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা, কোটা ব্যবস্থার সংস্কার আর দুই-একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির পদত্যাগ।
কিন্তু যখন আবু সাঈদকে এভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে মারা হলো এবং দমন-পীড়ন বাড়ল, তখন আর কোটা আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকল না। সেটা একদফা দাবিতে রূপ নিল–সরকারের পদত্যাগ।
ভারতের সরকার হয়তো বাংলাদেশের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। পরিস্থিতি যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে না যায় সেজন্য শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা ছিল বুদ্ধিমানের মতো কাজ, যার ফলে বড় কোনো বিপর্যয় এড়ানো গেছে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর একটা কথা খুব ভালো করে বোঝা দরকার–আজকের তরুণদের আপনি বোকা বানিয়ে রাখতে পারবেন না। সমাজে যা কিছু অন্যায় বা ভুল, তা তারা মুখ বুঝে মেনে নেবে কিংবা সব সময় বাধ্য আর শান্ত হয়ে থাকবে–এই আশা করা এখন ভুল।
‘আমাদের আমলে তো এমনটাই হয়ে আসছে’–এই পুরোনো দোহাই এখন আর চলবে না। তরুণেরা প্রচলিত নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার শিকড় ধরে টান দিচ্ছে।
যে নিয়ম বা প্রথা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, তার বিরুদ্ধে তারা এখন সোচ্চার।
সংবাদপত্রের সর্বশেষ খবর বলছে, ভারতে আন্দোলনকারীরা খুশি কারণ তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু মন্ত্রী সরানোই শেষ কথা নয়, প্রশ্নফাঁস বন্ধ করাসহ শিক্ষাব্যবস্থার আরও বড় সংস্কার তাদের মূল দাবি।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারগুলোর উচিত তরুণদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলা। তরুণরা কী ভাবছে, কী নিয়ে তাদের কষ্ট বা ক্ষোভ–সেগুলো শোনা এবং সমাধান করা দরকার।
তাদের সব দাবি বা আইডিয়া হয়তো একবারে বাস্তবায়নযোগ্য বা যুক্তিযুক্ত নাও হতে পারে। কিন্তু আলোচনা চালু রাখাটা জরুরি। তা না হলে ক্ষমতার আসনে বসে থাকা মানুষগুলো সাধারণ মানুষের মন থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আর ক্ষমতার সাথে সাধারণ মানুষের এই দূরত্ব যখন বিশাল এক খাদে পরিণত হয়, তখন কী পরিণতি হতে পারে–তা তো আমরা খুব ভালো করেই জানি। আমরা তো জুলাই-আগস্টের সেই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি!
একটা কথা মানতেই হবে–পৃথিবীর যেকোনো দেশের তরুণদের মধ্যে কিছু চমৎকার মিল থাকে। তারা আদর্শ নিয়ে বাঁচে, তাদের নিজস্ব বিবেক আছে এবং তাদের রক্তে আছে সমাজটা সুন্দর করার সৎ ইচ্ছে।
শেক্সপিয়র বহু আগেই বলে গেছেন: ‘সততা সব সময়ই সাহসী, আর যা ভালো–তা কখনো ভয় পায় না।’


