চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলীখেলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বৈশাখী মেলা ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে। শনিবার অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত বলীখেলা। তবে তার আগেই নগরের লালদীঘি মাঠ, কে সি দে রোড, কোর্ট সড়কসহ আশপাশের সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে বসেছে নানা পণ্যের পসরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এখন উৎসবমুখর।
মেলায় ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিন আগ থেকে ধীরে ধীরে দোকান বসানো শুরু হলেও এখন পুরোদমে চলছে কেনা-বেচা। শুধু চট্টগ্রাম নয়, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, দিনাজপুর ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তারা পণ্য নিয়ে এসেছেন। ফলে মেলাটি পরিণত হয়েছে এক বিশাল গৃহস্থালি পণ্যের মিলনমেলায়।

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে শীতল পাটি, হাতপাখা, ঝাড়ু, ফুলের টব, বাচ্চাদের খেলনা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, দা-বঁটি, আসবাবপত্র, গৃহসজ্জার সামগ্রী থেকে শুরু করে বাহারি খাবার–সবকিছুই। ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
মূলত লালদীঘি মাঠকে কেন্দ্র করে এই মেলা ও বলীখেলা আয়োজন করা হলেও আশপাশের প্রায় দুই থেকে তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দোকানপাট। এতে পুরো এলাকা যেন এক বিশাল উন্মুক্ত বাজারে পরিণত হয়েছে।

তবে এবার চলমান এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলা অনুষ্ঠিত হবে দুই দিন। শনিবার বলীখেলার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন। তাই ব্যবসায় নিয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দূর থেকে আসা ব্যবসায়ীরা।
নরসিংদী থেকে আসা ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতি বছরই এই মেলায় আসেন এবং এবারও ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার পণ্য এনেছেন।

তবে এবারের মেলা দুই দিনে সীমিত হওয়ায় তিনি কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগে জানতাম না মেলা কমদিন চলবে। এখন এত পণ্য বিক্রি হবে কি না, সেটা নিয়ে ভাবছি।’
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা থেকে আসা স্বপন কুমার পালও। তিনি প্রায় ৭ লাখ টাকার মাটির তৈরি গৃহসজ্জার সামগ্রী নিয়ে এসেছেন। তার আশঙ্কা, স্বল্প সময়ে বিক্রি না হলে খরচ তুলতে সমস্যা হতে পারে।
তবে আয়োজকর বলছেন, ব্যবসায়ীরা লস করবেন না। দুই দিন মেলা চললেও খরচ পুষিয়ে লাভ করতে পারবেন।

বলিখেলা ও বৈশাখী মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব শওকত আনোয়ার বাদল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এবারও তিন দিন চেয়েছিলাম। কিন্তু আশপাশে পরীক্ষা কেন্দ্র আছে। তাই শুক্র ও শনিবার মেলা করছি। এই মেলায় প্রচুর মানুষ হয়, অনেকে সারা বছরের গৃহস্থালি জিনিস কিনে নেন এখান থেকে। বৃহস্পতিবার থেকে বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ভালো লাভ করতে পারবেন।’
এবার মেলার সময়সীমা একদিন কমে গেলেও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই বৈশাখী মেলা ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। শনিবারের বলীখেলাকে ঘিরে সেই আমেজ আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা সবার।

মেলায় ঘুরতে এসে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব আব্দুল আলীম টাইমসকে বলেন, ‘জব্বারের বলিখেলা ও বৈশাখী মেলা আমি আমার জীবনে শুধু একবার হতে দেখিনি, সেটা হলো কোভিডের কারণে। এর বাহিরে প্রতিবার হয়, আমি আসি, মানুষের উচ্ছ্বাস দেখি। এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা হচ্ছে। এই রোদের মধ্যেও নারী, পুরুষ ও শিশুরা মেলায় এসে কেনাকাটা করছেন। সারা বছরের গৃহস্থালির জিনিস এখান থেকে কিনবেন। আমি এরমধ্যে প্রচুর বিক্রি হতে দেখছি।’
তবে এবার ব্যানারে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের নাম একটু বড় দেখা যাওয়ায় তিনি সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘জব্বারের বলিখেলা নামটা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। এটার সঙ্গে আরেকটা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখলে অস্বাভাবিক লাগে।’ এদিকে বলিখেলা ও মেলার আগে মনুমেন্ট নির্মাণ ও সার্বিক আয়োজনকে প্রশংসা করেন।

মূলত জব্বারের বলীখেলা চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোকজ ক্রীড়া আয়োজন। এর সূচনা করেন ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর। ধারণা করা হয়, ১৯০৯ সালের দিকে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তরুণদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও সাহসী করে তুলতে এই বলীখেলার প্রচলন করেন। প্রতিবছর বাংলা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বলীরা (কুস্তিগির) অংশ নেন। তারা শক্তি, কৌশল ও দক্ষতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন, যা দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
এই খেলা উপলক্ষে প্রতিবছর লালদিঘী মাঠ ও এর আশপাশে বৈশাখী মেলা আয়োজন করা হয়। মেলায় দেশজ পণ্য, হস্তশিল্প, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ কারুশিল্পীদের জন্য এটি বড় একটি বিক্রয়মঞ্চ।


