লালমনিরহাট আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাটের সীমান্তঘেঁষা জনপদে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। জেলার তিনটি আসনেই এখন বইছে ভোটের উৎসব। তবে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন নারী ভোটাররা। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ায় তাদের কেন্দ্রে টানতে এবং মন জয় করতে উন্নয়নের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
লালমনিরহাটের তিনটি আসনে এবার মোট ২২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, লালমনিরহাট-১ আসনে ২ লাখ ৮৫২ জন নারী, ২ আসনে ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৬১ জন এবং ৩ আসনে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮১ জন নারী ভোটার রয়েছেন। সব মিলিয়ে জেলার অর্ধেক ভোটই নারীদের। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক
পটপরিবর্তনে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা উল্লেখ করে নারী ভোটাররা বলছেন, তারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, এবার কাজের প্রতিফলন দেখতে চান।
লালমনিরহাট সদরের বিবাহিত তরুণী রেখা খাতুন (২৯) বলেন, ‘আমরা শুধু ভোটের মেশিন হতে চাই না। আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুনিশ্চিত ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থান যে প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারবেন, ভোট তাকেই দেব।’
নারী উদ্যোক্তা রাশেদা খাতুন বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনে নারীরা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। নারী উদ্যোক্তারা নানামুখী সুবিধা প্রত্যাশা করে। অথচ আমাদের জেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্প-কারখানা নেই। ফলে শিক্ষিত মেয়েরা বেকার বসে আছে। আমরা এমন প্রতিনিধি চাই যিনি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার নিশ্চিত করবেন।’
নারী অধিকার কর্মী মরিয়ম বেগম (৪০) আক্ষেপ করে বলেন, ‘নারীরা ঘরবন্দি থাকার পাত্র নয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলে নারীদের সমাজ বিনির্মাণে কাজে লাগাতে হবে। এ জেলার প্রধান সমস্যা নদী ভাঙন ও বেকারত্ব। বিশেষ করে তিস্তাপাড়ের নারীদের জীবন অনেক কঠিন। কর্মসংস্থানের অভাব আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা।’
নারী ভোটারদের এই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করব। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের কৃষিতে বিপ্লব আসবে।’
‘মোগলহাট স্থলবন্দর ও লালমনিরহাট বিমানবন্দর চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো হবে, যা পরোক্ষভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। এ ছাড়া, নারীদের কর্মসংস্থানে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করতে কাজ করা হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আবু তাহের বলেন, ‘কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে নারীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি আমাদের মূল লক্ষ্য। নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা সবসময় সোচ্চার। একটি ইনসাফ কায়েম সমাজ গঠন করতে পারলে নারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতায়িত হবে।’
জাতীয় পার্টির জেলা সদস্য সচিব জাহিদ লিমন জানান, লালমনিরহাটকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট জেলা হিসেবে গড়তে হলে নারীদের বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের বিকাশের মাধ্যমে আমরা ঘরোয়া পর্যায়ে নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে কাজ করব।
লালমনিরহাটের একপাশে তিস্তা নদী আর অন্য পাশে ভারতীয় সীমান্ত। এ অঞ্চলের বড় চ্যালেঞ্জ মাদক, বেকারত্ব ও নদী ভাঙন। জেলায় কোনো ভারী শিল্প-কারখানা না থাকায় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী তেমন না থাকায় কিছুটা হতাশ সচেতন ভোটাররা।
এখন পর্যন্ত লালমনিরহাটের নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ভোটাররা আশা করছেন, এবারের নির্বাচনে এমন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় থাকবে, যাতে তারা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে পারেন।


