ইরানের ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব ধরনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটির আধাসামরিক ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। এক বিবৃততে তারা বলেছে, ‘এই অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য, নয়তো কারও জন্য নয়।’
আইআরজিসির হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই ইরানের উত্তরাঞ্চলে হামলা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টার অভিযোগ তুলে একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ইরান উপকূলে সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্ত করেছে ওয়াশিংটন।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, মার্কিন হামলার জবাবে ভোরে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্থাপনাকে হামলার লক্ষ্যবস্ত করে তেহরান। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গত কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় ইরান যুদ্ধ বন্ধের অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন দফায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। সবশেষ মার্কিন হামলায় প্রথমবারের মতো ইরানের রাজধানী তেহরানের আশপাশের এলাকাতেও হামলা চালায় ওয়াশিংটন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুদ্ধ থেকে ‘জয়ী’ হিসেবে নিজেদের বের করে আনার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রসাশন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সফল হতে পারেনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারকে সই করার মাধ্যমে তারা সংঘাত থেকে বের হওয়ার উপায় পেলেও অন্য শর্তে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। কাজেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বুধবার আবারও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী চুক্তির শর্ত পূরণ না করলে ইরান আরও বড় সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।
দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলেও ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত।
বুধবার পেনসিলভানিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যুদ্ধ কলেজে এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) আমরা যা করছি তা পছন্দ করছে না এবং সমাধান করতে চায়। আমরা দেখব তাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি কি না, নাকি বিষয়টি শেষ করে দিই।’
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ২০২৪ সাল থেকে ‘ভুলভাবে’ আটক রাখা এক মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করে যুদ্ধ বন্ধে সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছে। তবে তিনি ওই ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
মানবাধিকার আইনজীবী জ্যারেড জেনসার এক বিবৃতিতে জানান, ওই ব্যক্তি তার মক্কেল ডেনা কারারি। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বৈত নাগরিক এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
অবশ্য ইরান তাৎক্ষণিকভাবে তার মুক্তির বিষয়টি স্বীকার করেনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের আশপাশের এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া ইরানের সেমনান প্রদেশেও মার্কিন হামলার খবর পাওয়া হয়েছে। ওই প্রদেশে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও মহাকাশ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
এর আগে বুধবার দিনের বেলায় ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গ্রেটার তুনব দ্বীপে হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপের দিকে যাওয়া কিউরাসাও পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ বেলমার ওপর গুলি চালানোর দাবিও করেছে মার্কিন সেনারা।
সেন্টকমের দাবি, একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পরও তারা যাত্রা অব্যাহত রাখার মার্কিন বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাহাজটির ধোঁয়া নির্গমন পথ ক্ষতিগ্রস্ত করে সেটিকে অচল করে দেওয়া হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্র সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে ইরানের ৩৮৮তম যান্ত্রিক পদাতিক ব্রিগেডের একটি ব্যারাকে হামলা চালিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে নিহত সাতজনের মধ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনকারী সেনা ও পেশাদার সেনাসদস্য ছিলেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন সেনা আহত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।


