‘সংসদ হোক মজলুমের মিলনমেলা, চাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’

‘সংসদ হোক মজলুমের মিলনমেলা, চাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে
Advertisement
Advertisement

জাতীয় সংসদকে দেশের মজলুম ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার ‘মিলনমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি স্পিকারের অভিভাবকত্বকে আরও বলিষ্ঠ করার অনুরোধ জানান এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় রোধ, সুষম উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের নীতিগত ও কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেন।

বুধবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব দাবি জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

জাতীয় সংসদের গুরুত্ব তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই সংসদটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং আমরা এটিকে মজলুমের মিলনমেলা বলে বিশ্বাস করি। এই সংসদের কার্যক্রম যত বেশি সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে, দেশের মানুষের মন থেকে হতাশা তত বেশি দূর হবে, তাদের আস্থা ও ভরসা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশ গড়ার মহৎ কাজে তারা অনুপ্রাণিত হবেন।’

স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সংসদের অভিভাবক হিসেবে আপনার জায়গাটা আরও সুদৃঢ় দেখতে চাই। সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি ও নীতিমালার পরিপালন নিশ্চিত করতে স্পিকারকে একজন বলিষ্ঠ কমান্ডারের ভূমিকা পালন করতে হবে।’

বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সম্প্রতি একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে পাশ হয়েছে, যা দেশের স্বার্থে, বেকারত্ব দূরীকরণে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জরুরি ছিল। কিন্তু বিলটির ওপর মনের মতো করে বিস্তারিত আলোচনা ও অংশগ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট সুযোগ থেকে বিরোধী দল বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা না রেখে বিরোধী দলের সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। অন্যথায় সংসদে বসা এবং জনগণের অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া আর কোনো উপকারে আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যায়, ভূমিধসে ও পানিতে ডুবে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। এবারের বন্যায় চারটি বিভাগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতি ছিল সবচেয়ে বেশি। নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আরও পড়ুন

রাজধানী ঢাকার নাজুক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিয়ে শফিকুর রহমান তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহর ময়লা ও ড্রেনের পানিতে ভেসে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ময়লা পানি অনেক সময় সুপেয় পানির লাইনের সঙ্গে মিশে পানি দূষিত করছে।

ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, বিদেশি অতিথিরা যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন ঢাকা দেখেই তারা পুরো দেশ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পান। তাই ঢাকাকে তিলোত্তমা ও দৃষ্টিনন্দন করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তরে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রযোজ্য, কারণ ধর্ম মানুষকে শালীনতা, দেশপ্রেম ও সৎ হতে শেখায়।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং অবহেলিত স্বতন্ত্র মাদ্রাসাসমূহের উন্নয়নে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে সঠিক যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান।

উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও আর্থিক পদক্ষেপে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি। সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যদের বড় অংকের ফান্ড বা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকে তা দেওয়া হয়নি।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে সুষম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আমরা সেই সুষম বণ্টনটাই প্রত্যাশা করি। রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে যেন সাধারণ জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন।

সরকারি অর্থ অপচয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নামফলক বসানোর প্রাচীন কালচার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারি টাকায় কোনো ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামে স্থাপনার নামফলক বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের এই অপরাজনীতি দেশের জন্য চরম ক্ষতি ডেকে আনে। কারও যদি নিজের নামের মোহ থাকে, তবে তিনি নিজের টাকা ও জমিতে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নাম দিতে পারেন, তাতে কারও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু জনগণের টাকায় কোনো আত্মপ্রচার গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা ‘দুর্নীতি’ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানান শফিকুর রহমান। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পূর্ববর্তী সফল কর্মযজ্ঞের প্রশংসা করে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী একজন গতিশীল মানুষ এবং তিনি চাইলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তবে এর জন্য দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন, সেখানে শফিকুর রহমান পরামর্শ দেন আপাতত দুর্নীতির হাত চেপে ধরুন এবং হাতকড়া পরিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন, যাতে আর কেউ জনসম্পদ লুটের সাহস না পায়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে অগ্রীম ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ নিয়মিত রেওয়াজ অনুযায়ী এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বিশেষ ইনসেন্টিভ বা বোনাস প্রদানের জোর দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad