উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলে ওয়াসিম আকরামকে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলেন শফিউল আলম ও জোসনা বেগম। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই জুলাই আন্দোলনের সময় সেই ছেলেকে হারানোর পর দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি। ছেলের কবরের পাশে সময় কাটাতেন বাবা। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিল তার শঙ্কা।
দুই বছর পর সেই শোক ও শঙ্কা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে ওয়াসিমের পরিবার। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র বোনের কাবিনও সম্পন্ন হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আর্থিক সহায়তায় অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও কমেছে। এখন পরিবারের অপেক্ষা ওয়াসিম হত্যার সুষ্ঠু বিচারের।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের তালিকায় দ্বিতীয় শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। আবু সাঈদ যেদিন শহীদ হন, সেদিনই চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলন চলাকালে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে ছুরিকাঘাতে ওয়াসিম নিহত হন।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুরার পাড়ার বাসিন্দা ওয়াসিম ছিলেন দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান (স্নাতক) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তার মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে।
ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি কর্মী মানুষ, কাজ করে খাই। জমি আছে, সেখানে চাষ করি। আর ১২ একর জমিতে চিংড়িঘের করি। যদিও গত বছর লোকসান হয়েছে। এবার আল্লাহ চাইলে লাভের মুখ দেখতে পাব।’
ওয়াসিমের মৃত্যুর কিছুদিন আগে বড় ছেলে আশেক আলীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন শফিউল আলম। ভাইয়ের মৃত্যুর পর দেশে ফিরে আসেন আশেক। এর মধ্যে তার বিয়েও হয়েছে। তবে বর্তমানে তিনি কোনো কাজ করছেন না।
ছেলের জন্য একটি চাকরি চেয়েছেন শফিউল আলম ও জোসনা বেগম। সম্প্রতি ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলেটি মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করেছে। ও খুব মেধাবী। কম্পিউটারসহ আধুনিক প্রযুক্তির সবকিছু জানে। সালাহউদ্দিন ভাই বলেছেন, ছেলের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।’
ওয়াসিমের একমাত্র বোন সাবরিনারও বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্রায় এক মাস আগে তার কাবিন সম্পন্ন হয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে শ্বশুরবাড়িতে নেওয়া বাকি। কিছুদিনের মধ্যে সেটিও হবে বলে জানিয়েছেন শফিউল আলম।
শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে ওয়াসিমের পরিবার। সর্বশেষ বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান পরিবারটিকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। শফিউল আলমের হিসাবে, তার পরিবার প্রায় ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই শহীদ পরিবার হিসেবে ওয়াসিমের পরিবার প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছে। এ ছাড়া, সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে পরিবারটি।
ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানান, সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতার পাশাপাশি ওয়াসিমের পরিবারের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের বাড়ির পাশে একটি ছোট মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে শফিউল আলমের ভাষ্য, সরকারি সহায়তার টাকায় একটি পরিবারের সব ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। তাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ব্যবসার জন্য ২০টি কিটকট বা পর্যটকদের চেয়ার এবং একটি ফিশ ফ্রাইয়ের দোকানের অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন তিনি। সরকারি টাকাও জমা দিয়েছেন। তবে এখনো অনুমোদন পাননি।
ছেলে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিএনপি তাদের পরিবারের খোঁজ রাখে না বলে দাবি শফিউল আলমের। তার ভাষ্য, সর্বশেষ রমজানের ঈদে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এসে বিএনপির পক্ষ থেকে ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর দলটির পক্ষ থেকে আর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার লোকজনের মাধ্যমে পরিবারের খোঁজ রাখেন এবং বড় ছেলের চাকরির আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান শফিউল আলম।
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ওয়াসিম আকরামের পরিবার কোটি কোটি টাকা পেয়েছে। সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা দিয়েছে। সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে কোনো না কোনোভাবে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। তারপরও যদি সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে কী করা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় সরকারি অনুদানের ৪ হাজার টাকা নিয়ে আমি গিয়েছিলাম। পরে জেনেছি, ওই পরিবার আমাদের নিয়ে খুব খারাপ মন্তব্য করেছে।’
ইকবাল হোসেন আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াসিমের ঘর পাকা করে দিয়েছেন। দুই কিলোমিটার রাস্তা পাকা করে দেওয়া হয়েছে। কবরস্থান পাকা করে দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও যদি শোকর না থাকে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ জানিয়েছে ওয়াসিমের পরিবার।
রায় ঘোষণার পর শফিউল আলম বলেছিলেন, ‘আমরা এই রায়ে খুশি হয়েছি। তবে রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।’
সম্প্রতি হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘটনায়ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তিনি। শফিউল আলম বলেন, ‘এটি হাসিনারও দেশ। তিনি চাইলে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি রাজনীতি করতে আসবেন না। তিনি আসবেন ফাঁসির রশি গলায় ঝুলাতে।’
ওয়াসিম হত্যার বিচার চায় তার পরিবার। একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান, সেই প্রত্যাশাও তাদের।
শফিউল বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমার ছেলের হত্যাকারীদের বের করে যেন সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়। কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে যেন এই মামলায় জড়ানো না হয়।’
কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শহরের মুরাদপুরসংলগ্ন ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওয়াসিমকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে আহত অবস্থায় তাকে মারধর করা হয়। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হলেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা আগে ফেসবুকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন ওয়াসিম। ওই পোস্টে নিজেকে উৎসর্গ করার কথাও লিখেছিলেন তিনি।
পরদিন ১৭ জুলাই কক্সবাজারের পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মুরার পাড়ায় গ্রামের বাড়িতে ওয়াসিমের মরদেহ দাফন করা হয়।
চলতি বছরের ১৩ জুন কক্সবাজার সফরের সময় পেকুয়ায় গিয়ে ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রী ছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ওয়াসিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারটিকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অনুদান দেন।


