আগামী বৃহস্পতিবার আসন্ন অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বাজেটের অংশ হিসেবে পাঁচ বছরের একটি কর রোডম্যাপের আওতায় ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বার্ষিক ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ আয়কর আরোপের প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন তিনি।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে কেবল অল্প সংখ্যক উচ্চ আয়ের করদাতা প্রভাবিত হবেন। মধ্যম আয়ের মানুষ এই নতুন কর সীমার বাইরেই থাকবেন। তবে অর্থনীতিবিদ এবং কর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের কারণে মেধা পাচার এবং পুঁজি পাচারের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রী ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিদ্যমান শূন্য থেকে ৩০ শতাংশের ব্যক্তিগত আয়কর হার বজায় রাখার প্রস্তাব করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বার্ষিক ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
বাজেট প্রস্তাবে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী চার বছরে এই সীমা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এই সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ ও ২০৩১-৩২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে।
নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতারা আগের মতোই অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন। প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য এই অতিরিক্ত করমুক্ত সুবিধার পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বহাল থাকবে। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অভিভাবকেরা প্রতিটি নির্ভরশীল সদস্যের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত সুবিধা পেতে থাকবেন।
কর ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে, করের পরিধি বিস্তৃত করতে এবং মধ্যমেয়াদে করের হার কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে এই রোডম্যাপটিকে একটি বড় কৌশলের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান করদাতাদের ওপর উচ্চ করের বোঝা না চাপিয়ে বরং কর আইন পরিপালন জোরদার করা এবং নতুন করদাতা তৈরির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করা।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ছাত্র এবং বাড়তি সুবিধাবিহীন সাধারণ হিসাব বা নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট ছাড়া যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।
আসন্ন বাজেটে একটি উইথহোল্ডিং আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা উইন চালু করা হবে। কর ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত করা হবে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং, ইউটিলিটি ও ভূমি নিবন্ধনের রেকর্ড। পাশাপাশি ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের জন্যও টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
তবে মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত রিকশামালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের আগের পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে এসেছে।
করের জাল বিস্তারের অংশ হিসেবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর চালু করা হবে, যা প্রতি ১ হাজার টাকার লেনদেনে ২ টাকা করের সমতুল্য। এই অর্থ চূড়ান্ত কর দায়ের সাথে সমন্বয় করা যাবে।
উৎসে কর্তনকৃত কর ফেরতযোগ্য হবে
বাজেট প্রস্তাবে উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যার ফলে এটি আর ব্যবসার জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর দায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। পরিবর্তে উৎসে কর্তনকৃত করকে অগ্রিম কর পরিশোধ হিসেবে গণ্য করা হবে, যা চূড়ান্ত কর দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। বাড়তি পরিশোধিত কর তিন বছর পর ফেরত পাওয়ার যোগ্য হবে।
কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থাটি অনেক সময় কম করযোগ্য আয়ের ব্যবসারও কার্যকরী মূলধন আটকে রাখে, যা বাজারে অপ্রয়োজনীয় তারল্য সংকট তৈরি করে। প্রস্তাবিত এই সংস্কার বাংলাদেশের কর কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কাছাকাছি নিয়ে যাবে, ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।
বিভিন্ন খাতে উৎসে করের হার হ্রাস এবং উৎস করের সংশোধিত নীতিমালার কারণে ব্যবসার তারল্য বাড়বে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
সরকার আশা করছে এই পদক্ষেপগুলো আগামী বছরগুলোতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে। করদাতাদের জন্য নিশ্চয়তা তৈরি করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হবে।
সফলভাবে করের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে যদি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়, তবে বর্তমানে তুলনামূলক উচ্চ কর হারের আওতাধীন খাতগুলোতে পর্যায়ক্রমে কর কমানোর ইঙ্গিতও দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। কেবল যেসব টেলিকম কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ার জনগণের কাছে রয়েছে, তারা ৫ শতাংশ কর্পোরেট কর ছাড় পেতে পারে, যার ফলে তাদের কর ৪৫ শতাংশ থেকে কমে ৪০ শতাংশ হবে।
বাজেট প্যাকেজে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, রপ্তানিকারক, উৎপাদনকারী, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কর হ্রাস ও অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পিত প্রণোদনা ও সুবিধাসমূহ
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেল এবং বীজসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অগ্রিম কর বিদ্যমান ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হবে।
চিকিৎসা খরচ কমাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর আমদানি অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত ১৫টি সহায়ক পণ্যের ওপর অগ্রিম কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে।
বাজেটে বেশ কয়েকটি সরবরাহ চেইনে ব্যাপক কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সোনা ও গহনা সরবরাহের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইক্লিং) কার্যক্রম ও কাঁচামালের ওপর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে। পরিবহন ও যানবাহন ভাড়া সেবার ওপর কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ এবং প্যাকেজিং উপকরণের ওপর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হবে।
জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর অগ্রিম কর ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং শোধনাগারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর কর ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। রপ্তানি প্রণোদনা সমন্বয় করা হবে এবং নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হবে।
দেশীয় উৎপাদন শিল্পকে সহায়তা করতে মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম এবং সিসিটিভি যন্ত্রপাতির স্থানীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
প্রসাধন সামগ্রী আমদানির কাস্টমস মূল্যায়নেও সংশোধন আনা হচ্ছে। লিপস্টিকের প্রতি কেজির নির্ধারিত মূল্য ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার এবং লোশন, ফেস ক্রিম ও ফেস ওয়াশের মূল্য ১০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার করা হবে।
ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করতে পিওএস মেশিনের ওপর আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হবে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হবে।
বাণিজ্য নীতিতে ১১৩টি আমদানিকৃত পণ্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে এবং আগে ভ্যাট অব্যাহতি পাওয়া ২০টি পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হবে।
বেশ কিছু কৌশলগত খাতে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা দেওয়া হবে। সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামালের ওপর ২০৩১ সাল পর্যন্ত, ব্যাটারি উৎপাদন উপকরণের ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত, ৩৬টি কীটনাশকের কাঁচামাল এবং ৫১টি সক্রিয় ওষুধ উপাদানের (এপিআই) ওপর কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। ফ্রুট ফিলেটের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক করা হবে এবং মর্গ বা লাশ রাখার হিমাগারের যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হবে এবং সৌর বিদ্যুতের বিল পরিশোধের ওপর ৫ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা চালু করা হবে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ইভি চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস এবং বৈদ্যুতিক ট্রাক আমদানির ওপর শূন্য শুল্ক নির্ধারণ করা হবে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের নিবন্ধন এবং নবায়ন কর ফ্ল্যাট ২ লাখ টাকা থেকে পরিবর্তন করে ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা এবং ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার যানবাহনের জন্য ১ লাখ টাকা কর নির্ধারণ করা হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির শুল্ক বিদ্যমান প্রায় ৯৩ শতাংশ থেকে সংশোধন করা হবে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ওপর ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ওপর ৮০ শতাংশ শুল্ক ধার্য হবে। এছাড়া ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে এবং টাগবোট আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হবে।
কৃষিভিত্তিক মূল্য সংযোজন খাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ ব্যবহার করে দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনের জন্য ১০ বছরের কর অব্যাহতি দেওয়া হবে।
পরিশেষে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানো হবে। একই সাথে এসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে স্বস্তি দেওয়া হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে ম্যানুফ্যাকচারিং, পর্যটন এবং ক্রীড়া অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ ত্বরান্বিত অবচয় (অ্যাক্সিলারেটেড ডেপ্রিসিয়েশন) সুবিধা চালু করা হবে।


