কোনো দেশের অপরাধীদের কীভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে, তা থেকে সহজেই অনুমেয় সে দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কুশিলবদের মূল চরিত্র। দেশ থেকে বিদেশে পাড়ি, আবারো গা ঢাকা দিয়ে দেশে অনুপ্রবেশ– অপরাধ রাজ্যের সেরাদের এমন গোপন চলাচলে ধরা পড়ে রাষ্ট্রের আঁতাত, নীরব সহমত, এমনকি অন্ধকার জগতের অমোঘ নির্দেশনাও। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার যেন এমনই এক ‘নাটকের ভেতরের নাটকের’ পর্দার উন্মোচন।

টাইমস অব বাংলাদেশের খবরে প্রকাশ, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন ধরিয়ে দেওয়ার শর্তে দেশের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে, তখন ওই তালিকার শীর্ষে ছিলেন সুবত বাইন। পরের আড়াই দশকে পুলিশ ও র্যাব হেফাজতে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘এনকাউন্টারে’ এ তালিকার বেশ কয়েকজন নিহত হন। তবে প্রাণে বেঁচে যান সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, তানভীরুল ইসলাম জয়, বিকাশ বিশ্বাস, প্রকাশ বিশ্বাস, জোসেফ ও লেদার লিটন।
এর নেপথ্যে আর কিছুই নয়, রাজনীতিক ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই তারা ‘বেঁচেবর্তে’ থাকেন। কখনো ওপারের কলকাতার কালিঘাট, কখনো মুর্শিদাবাদ, কখনো বা ফ্রান্স, অথবা ঢাকার কোনো অতি ক্ষমতাধরের অট্টালিকার আশ্রয়ে ‘চড়ে বেড়ান’ তারা; কারণ সবসময়ই তাদের কদর ছিল। ওই সাত শীর্ষ সন্ত্রাসীর কেউ ছিলেন মন্ত্রীর ‘শেল্টারে’, কেউ ছিলেন দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ‘গোপন মিশনে’, কেউবা স্যাটেলাইট ফোনের ওপারে দূরদেশের নেতার মদদে। প্রশ্ন ওঠে—তাদের রক্ষাকর্তা কারা? কারাই বা তাদের সীমান্তের এপার-ওপারের অবাধ বিচরণকে সহজতর করে? কাদের প্রশ্রয়ে তারা বেঁচে থাকেন জামাই আদরে?
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেছেন, ‘তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ আজও সক্রিয়’। বর্তমান পুলিশ প্রধান বাহারুল আলমের কথায়ও উঠে আসে সন্দেহ—’পুলিশ সদস্য বা রাজনীতিবিদ কেউ যদি তাদের সহায়তা করে থাকেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তার এই বক্তব্যেই প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ পায় সন্ত্রাসীদের গোপনচক্র। সুব্রত বাইন যেমন ঠাণ্ডা মাথার খুনি, তেমনই ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ প্রশিক্ষিত কারিগর। এমনও গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, ওপারে তার হাতে ‘র’ তুলে দিয়েছে টার্গেটের ছবি, আর নির্ভুল নিশানায় বদলে গেছে অনেক হিসেব-নিকেশ। তার ট্রিগারই নাকি একাধিকবার ছন্দপতন ঘটিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্পন্দনে।
বেরিয়ে এসেছে, এমনও চাঞ্চল্যকর তথ্য– সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ প্রধান এবং এক বিদেশি কর্মকর্তা মিলে সুব্রতকে একটি ‘স্পেশাল মিশনের’ প্রস্তাব দেন। লন্ডনে ঘায়েল করতে হবে তার ‘টার্গেটকে’, আর পুরস্কার হিসেবে মিলবে বিপুল বিত্ত বৈভবসহ কানাডার নিরাপদ আশ্রয়।

প্রশ্নগুলো আরও জটিল হয়, যখন জানা যায়, বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে মগবাজারের বাসিন্দা সুব্রতর এক প্রতিবেশী, তৎকালীন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী তাকে নিরাপদে দেশ ছাড়তে সহায়তা করেন।
বিকাশ বিশ্বাসের জন্ম বাগেরহাটে হলেও আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্যের আশ্রয়ে ঢাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন সহজেই। ২০১৮ সালে গোপনে দেশত্যাগও করেন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সহায়তায়। অভিযোগ আছে, বিকাশ এখনো ফ্রান্সে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করেন ঢাকার অপরাধ চক্রের একাংশ।
মোল্লা মাসুদ একসময় পুরনো ঢাকার টেন্ডারবাজিতে ছিলেন বিএনপি ঘনিষ্ঠ, পরে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। বিকাশ বিশ্বাস চলে যান ফ্রান্স, জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পান, জয় প্রশিক্ষণে যান মধ্যপ্রদেশ, আর লিটন মাদক ও অস্ত্রপাচারের সাথে যুক্ত হয়ে হয়ে পড়েন ভারতীয় গোয়েন্দাদের চারণে।
সময় গড়ায়, ছদ্মবেশে সন্ত্রাসীদের নাম-পরিচয় বদলায়, শুধু বদলায় না অপরাধ আর পৃষ্ঠপোষকের মুখোশের আড়ালের মুখ। রাষ্ট্র যে কখনো তাদের শত্রু, কখনো বন্ধু, আর প্রয়োজনে হয়ে যায় ‘স্পনসর’। এই রাষ্ট্রের গর্ভেই জন্ম নেয় ছায়া-রাষ্ট্র, যেখানে সুব্রতরা রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অপরাধী হয়েও রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাজনীতিবিদদের কাছে ‘সম্পদ’।
কিন্তু এই মূল্য কিসের বিনিময়ে? সুব্রত বাইন যখন এক ছাত্রদল নেতাকে হাতিরঝিলে গুলি করেন, তখন তিনি কেবল একজন খুনি নন—তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের অধঃপতিত নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি। সুব্রত যখন কারাগারে বসে মিশন পরিকল্পনা করেন, তখন আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রকৃত পরাজিত চিত্র প্রকাশ পায়।
আমরা জানি, বিচারহীনতার এই রাজনীতিতে সুব্রতরা বরাবরই বেঁচে থাকবেন। হয়তো তারা আবার আসবেন, আবারও মাথার ওপর পাবেন আশির্বাদের হাত, প্রত্যক্ষ ‘আদর ও কদরে’ হলিউডি সিনেমার কায়দায় পাবেন প্রশিক্ষণ, মিশন থেকে মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন দেশে-বিদেশে। প্রকট কোনো সন্ত্রাস প্রকাশ্যে এলে রাষ্ট্র হয়তো আবারও প্রচার করবে—এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়, এগুলো আসলে ৫৪ বছরের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল, যার নেপথ্যে রয়েছে পঁচন ধরা রাজনীতির ইতিকথা।


