রাজধানী ঢাকার খুব কাছে হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা। প্রায় পৌনে চার লাখ মানুষের এই জনপদে গত চার মাসে প্রধানমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী আকস্মিক সফর করেছেন। এসব হাই-প্রোফাইল সফর সিংগাইরকে জাতীয়ভাবে আলোচনায় আনলেও, এলাকার দীর্ঘদিনের প্রধান দাবিগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
চলতি বছরের ১১ মার্চ জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী কোনো প্রটোকল ছাড়া সিংগাইর উপজেলা পরিষদ পরিদর্শন করেন। এর তিন দিন পর, ১৪ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্থানীয় হাসপাতালে আকস্মিক অভিযানে গিয়ে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন। এরপর ২১ এপ্রিল এসএসসি’র পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সবশেষে গত ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামির্ত্তা ইউনিয়নে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শন করেন।
ভিআইপিদের ঘন ঘন সফরের পরও স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন—জনগণের মূল দাবিগুলো পূরণ হবে কবে?
হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা এই এলাকার সবচেয়ে বড় দাবি। সরু এই রাস্তাটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই সড়ক নিয়ে ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আমার বাবাসহ অনেকেই এখানে প্রাণ হারিয়েছেন। নতুন সরকারের উচিত দ্রুত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা।’
জানা গেছে, সড়কটি চার লেনে রূপান্তরের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খান রিতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। তবে এখনো তার কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
সড়কের পাশাপাশি সিংগাইরে গ্যাস সংযোগ দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। গ্যাস না থাকায় এখানে কলকারখানা গড়ে উঠছে না, ফলে বেকারত্ব দূর হচ্ছে না। এছাড়া পাটুরিয়া রেললাইন সিংগাইরের ওপর দিয়ে নেওয়া, সিংগাইর সরকারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় করা এবং ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবিও বহু পুরনো।
উপরন্তু, ঢাকা কাছে হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা সিংগাইরে না থেকে ঢাকা বা সাভারে থাকেন। ফলে সাধারণ মানুষ সময়মতো সরকারি সেবা পান না।
এই পরিস্থিতি নিয়ে জামির্ত্তা ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আবু সায়েম বলেন, ‘চার লেন সড়ক, গ্যাস সংযোগ ও শিল্পায়নের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো সংশ্লিষ্টদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।’
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি কবি ও সাহিত্যিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সফর সিংগাইরের জন্য ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগে সড়ক, গ্যাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের দাবিগুলো সরকারের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা।’
তবে জনগণের এই আক্ষেপের বিষয়ে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত জানান, ‘আমরা তো মন্ত্রীদের কোন প্রোগ্রাম করে আনিনি। মন্ত্রীরা তাদের সুনির্দিষ্ট কাজে এসেছিলেন। তারা যখন আসেন জনগণের যে প্রত্যাশা সেটা বলার সুযোগ থাকে না।’
সিংগাইরবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা, সরকার যেন শুধু পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে এই অঞ্চলের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত হাত দেয়।


