সততা কি তবে বোকামি?

সততা কি তবে বোকামি?
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

সমাজ দিন দিন বদলে যাচ্ছে। কিন্তু তা ভালো দিকে হচ্ছে না। আমরা বাইরে থেকে অনেক উন্নত হচ্ছি। মানুষের হাতে এখন অনেক টাকা। চারদিকে বড় বড় ভবন তৈরি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে দামি গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের সততা কমে যাচ্ছে। আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যেখানে টাকা থাকলেই সব পাওয়া যায়। আর টাকা না থাকলে মানুষের কোনো মূল্য থাকে না। এই মানসিকতা পুরো সমাজকে গ্রাস করছে। দুর্নীতি আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করছে না। এটি ভেতরের ভালো মানুষটিকে মেরে ফেলছে। আমাদের সুন্দর মূল্যবোধগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে।

দুর্নীতি আজ এক মহামারি। এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা যখন ছোট থাকি, তখন অনেক ভালো ভালো কথা শেখানো হয়। সততাই সর্বোত্তম পন্থা, এটি সবাই বইয়ে পড়েছি। কিন্তু বড় হয়ে যখন আমরা বাস্তব সমাজে পা দিই, তখন অন্য চিত্র দেখতে পাই। আমরা দেখি অসৎ মানুষরা খুব সুখে আছে। তারা বিলাসী জীবন কাটাচ্ছে। তাদের সমাজে অনেক সম্মান। আর যারা সৎ পথে চলার চেষ্টা করছেন, তারা প্রতিনিয়ত কষ্ট করছেন। তারা পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এই অবস্থা দেখে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে। তারা ভাবছে, সৎ থেকে কী লাভ? সততা কি তবে বোকামি? এসব ভাবনাই জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের সংকেত।

আজকের দিনে অবৈধ অর্থ যেন কোনো অপরাধ নয়। মানুষ এখন খুব সহজেই অন্যায় উপায়ে টাকা রোজগার করছে। এই টাকা দিয়ে তারা সমাজে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। দামি পোশাক, দামি গাড়ি, বড় বাড়ি এগুলো এখন আধুনিকতার লক্ষণ। মানুষ এখন আর জানতে চায় না এই টাকা কোথা থেকে এলো। কেউ প্রশ্ন করে না আপনার বেতন কত আর আপনার লাইফস্টাইল কেমন। মানুষ শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মুগ্ধ হয়। সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি দুর্নীতিকে আরও বেশি উৎসাহিত করছে। অন্যায়ের মাধ্যমে অর্জিত বিত্ত আজ আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক ভিত্তিকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো মানুষের মনের ঈর্ষা। কেউ যখন অন্যায় করে অনেক টাকার মালিক হয়, তখন অন্যরা তাকে ঘৃণা করে না। উল্টো অনেকে মনে মনে ভাবেন, আমার যদি এমন থাকত! এই যে অন্যের অবৈধ সম্পদের প্রতি লোভ, এটি সমাজকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট হই, তখন অন্যায় আর অন্যায় থাকে না। সেটি একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। আজ সমাজে এটিই ঘটছে। দুর্নীতি এখন আর কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি এখন অনেকের কাছে এক ধরনের যোগ্যতা। যে যত বেশি দুর্নীতি করতে পারে, তাকে তত বেশি চালাক ও সফল ভাবা হয়। এই নোংরা মানসিকতা পরিচ্ছন্ন সমাজকে কলুষিত করছে।

আমরা প্রায়ই ভাবি, শুধু কঠোর আইন দিয়ে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব। সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমরা ভাবি, পুলিশ বা আদালত সব ঠিক করে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুধু আইন দিয়ে কোনোদিন মানুষের মন বদলানো যায় না। আইনের চোখে ধুলো দেওয়া খুব সহজ। যারা বড় বড় অপরাধ করে, তারা আইনের ফাঁকফোকর ভালো করেই জানে। অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এতে আইনের শাসন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই বুঝতে হবে, আইন হলো সমস্যার একটি ছোট সমাধান। আসল সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের ভেতরে, আমাদের মানসিকতার মধ্যে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলন কোনো ভাঙচুরের আন্দোলন নয়। এটি মানুষের চিন্তার ভেতরের পরিবর্তন। রুখে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখতে হবে। এই কাজটির শুরু হতে হবে আমাদের নিজেদের ঘর থেকে। পরিবার হলো একটি মানুষের আদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি শিশু তার মা-বাবাকে দেখেই বড় হয়। মা-বাবা যদি সৎ হন, তবে সন্তানও সৎ হতে শেখে। কিন্তু আজ অনেক পরিবারেই এই শিক্ষার অভাব দেখা যাচ্ছে। মা-বাবা সন্তানদের হাতে দামি জিনিসপত্র তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু ওই টাকা কীভাবে আসছে, তা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছেন না।

এখানেই তরুণ প্রজন্মের বড় দায়িত্ব রয়েছে। তরুণ সমাজকে আজ সচেতন হতে হবে। তাদের মনে প্রশ্ন তোলার সাহস থাকতে হবে। একজন সন্তান যখন দেখবে তার বাবার হঠাৎ অনেক টাকা হয়েছে, তখন তার চুপ থাকা উচিত নয়। সন্তানকে খুব সহজ ভাষায় বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। এই টাকা কোথা থেকে এলো? এটি কি আপনার কষ্টের উপার্জিত অর্থ? এই একটি প্রশ্ন একজন বাবাকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। লোকলজ্জার ভয় ও সন্তানের কাছে ছোট হওয়ার ভয় মানুষের মনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। তরুণরা যদি এই প্রশ্ন করা শুরু করে, তবে অনেক বাবা অন্যায় পথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন।

আরও পড়ুন

একই কথা খাটে স্ত্রীদের ক্ষেত্রেও। সংসারে সুখ সবার কাম্য। কিন্তু ওই সুখ যদি অন্যের চোখের জলের ওপর তৈরি হয়, তবে তার কোনো মূল্য নেই। স্বামীদের উপার্জনের দিকে স্ত্রীদের কৌতূহল থাকতে হবে। স্বামীর আয়ের সঙ্গে যদি ব্যয়ের মিল না থাকে, তবে স্ত্রীদের সতর্ক হতে হবে। দামি গহনা ও বিলাসবহুল জীবন পেয়ে অন্ধ হয়ে গেলে চলবে না। স্ত্রীদের মনে রাখতে হবে, অবৈধ অর্থ সংসারে শান্তি আনে না। বরং অশান্তি ও অভিশাপ নিয়ে আসে। একজন স্ত্রী যদি তার স্বামীকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন তিনি অন্যায়ের টাকা ঘরে নিতে দেবেন না, তবে কোনো স্বামীই দুর্নীতি করার সাহস পাবেন না।

বন্ধু ও আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও আমাদের একই ভূমিকা নিতে হবে। কোনো বন্ধু যখন সৎ পথ ছেড়ে অসৎ পথে পা বাড়ায়, তখন বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব তাকে বাধা দেওয়া। তাকে বোঝানো এই পথ সঠিক নয়। যদি তার এই অবৈধ টাকাকে বাহবা দিই, তবে আমরা তার ক্ষতি করছি। আত্মীয়-স্বজনদের উপার্জনের ওপর নজর রাখতে হবে। আমরা যদি দেখি কোনো নিকটজন অন্যায়ভাবে টাকা উপার্জন করছেন, তবে উচিত তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। সমাজে সৎ মানুষের একটা বলয় তৈরি করতে হবে। অসৎ মানুষদের ওই বলয়ের বাইরে রাখতে হবে।

দুর্নীতিবাজদের সামাজিক বয়কট করা আজ সময়ের দাবি। আমরা আজ সমাজে উল্টো চিত্র দেখি। যারা বড় দুর্নীতিবাজ, তারা সমাজের বড় বড় পদে বসে থাকেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের প্রধান অতিথি করা হয়। মানুষ তাদের সঙ্গে সেলফি তুলতে ব্যস্ত থাকেন। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতিবাজ সে যেই হোক না কেন, তাকে সমাজ থেকে আলাদা করে দিতে হবে। তাকে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া যাবে না। তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের মেলামেশা বন্ধ করতে হবে। যখন একজন দুর্নীতিবাজ দেখবে টাকা থাকা সত্ত্বেও সমাজে তার কোনো সম্মান নেই। কেউ তাকে পছন্দ করে না, তখন সে একা হয়ে পড়বে। এই একাকিত্ব ও সামাজিক অপমান তাকে অপরাধের পথ থেকে সরিয়ে আনবে।

শিক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা শেখায়। ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা এখানে খুব কম দেওয়া হয়। পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতার গল্প আরও বেশি থাকা উচিত। ছোটোবেলা থেকেই শিশুদের মনে সততার বীজ বুনে দিতে হবে। তাদের শেখাতে হবে, অন্যের হক নষ্ট করা সবচেয়ে বড় পাপ। অল্পে সন্তুষ্ট থাকার একটি মানসিক শান্তি আছে, তা তাদের বোঝাতে হবে। লোভ কীভাবে মানুষকে ধ্বংস করে, তার উদাহরণ দিতে হবে। শিক্ষকরা যদি নিজেরা সৎ হন ও শিক্ষার্থীদের ওই শিক্ষা দেন, তবে একটি সুন্দর প্রজন্ম তৈরি হবে।

চারপাশের পরিবেশকে শুদ্ধ করতে হলে আমাদের নিজেদেরও বদলাতে হবে। নিজেরা ছোট ছোট দুর্নীতি করি, আর বড় বড় দুর্নীতির সমালোচনা করি। এটি এক ধরনের ভণ্ডামি। যখন লাইনে না দাঁড়িয়ে ঘুষ দিয়ে কাজ আগে করতে চাই, তখন আমরাও দুর্নীতির অংশীদার হই। যখন ট্রাফিক আইন অমান্য করে পার পাওয়ার জন্য টাকা দিই, তখন আমরাও সমাজকে নষ্ট করি। তাই পরিবর্তন প্রথমে নিজের থেকে শুরু করতে হবে। আমি নিজে সৎ থাকব, এই প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আমি নিজে কোনো অন্যায় সুবিধা নেব না। অন্য কাউকেও নিতে দেব না। এই মানসিকতা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

গণমাধ্যমের এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের চারপাশে অনেক সৎ মানুষ আছেন। তারা খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। কিন্তু তাদের সততা অনুকরণীয়। গণমাধ্যমে এই সমস্ত সৎ মানুষের জীবনের গল্প তুলে ধরা উচিত। তাদের জীবনের সংগ্রাম ও সততার পুরস্কার মানুষকে দেখানো দরকার। অন্যদিকে যারা দুর্নীতিবাজ, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। তাদের অপরাধের কথা সবার সামনে নিয়ে আসতে হবে। সমাজ যখন দেখবে সৎ মানুষেরা সম্মানিত হচ্ছেন আর অসৎ মানুষেরা লজ্জিত হচ্ছেন, তখন সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। মানুষের মনে সততার প্রতি শ্রদ্ধা ফিরে আসবে।

দুর্নীতির এই ক্ষতের গভীরতা অনেক বেশি। এটি পুরো শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সরকারি অফিস থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সব জায়গায় আজ এই সমস্যা। সাধারণ মানুষ একটি ছোট কাজের জন্য গিয়েও হয়রানির শিকার হন। এই হয়রানি থেকে বাঁচতে মানুষ বাধ্য হয়ে টাকা দেয়। এই ব্যবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই এক দিনে এটি ভাঙাও সম্ভব নয়। এর জন্য ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কাজের নিয়ম সহজ করতে হবে যাতে মানুষ দালালের খপ্পরে না পড়ে।

সুন্দর মূল্যবোধগুলোই আমাদের আসল সম্পদ। টাকা-পয়সা আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের চরিত্র একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। আমরা যদি একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ চাই, তবে আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। চারপাশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে একটি দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে দুর্নীতির কোনো প্রবেশাধিকার থাকবে না। যখন প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রশ্ন উঠবে, যখন সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হবে, তখনই এই দেশ সত্যিকারের উন্নত হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায়িত্ব সবার। এই দায়িত্ব সবাইকে পালন করতেই হবে।

লেখক: সহসম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর