কক্সবাজার-১ সংসদীয় আসনটি চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। একবার তার স্ত্রী হাসিনা আহমদও এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ফলে নির্বাচনী মাঠে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত সালাহউদ্দিন আহমদ এবারও আলোচনার কেন্দ্রে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তফসিল ঘোষণার পর গ্রাম, হাট, বাজার ও চায়ের দোকানে একটাই প্রশ্ন–কে হচ্ছেন চকরিয়া-পেকুয়ার পরবর্তী সংসদ সদস্য?
এই আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন। অপর তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ২১ জানুয়ারি স্ব স্ব প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ও জেলা রিটানিং অফিসার।
বৈধ প্রার্থীরা হলেন বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল-ফারুক, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আব্দুল কাদের।
অন্যদিকে, অবৈধ ঘোষিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ছরওয়ার আলম কুতুবী, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম। ফলে নির্বাচনী মাঠে সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে এখন দুই নবীন প্রার্থী। তবে নবীন হলেও জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখে আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার কৌশলী তৎপরতা চালাচ্ছে জামায়াত। দলীয় সংগঠন ও শৃঙ্খলাকে পুঁজি করে মাঠে সক্রিয় জামায়াত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল-ফারুক।
ভোটার সংখ্যা ও কেন্দ্র
কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫ জন।
এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৬ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ০৫ হাজার ৪৩৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৬১ জন।
এদিকে, পেকুয়ায় মোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৯৯ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭৯ হাজার ৩৭৫ জন আর নারী ভোটার রয়েছেন ৬৭ হাজার ২২৪ জন।
কক্সবাজারের এই আসনটিতে দুই উপজেলায় মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৫৯টি। এর মধ্যে চকরিয়ায় ১১৬টি ও পেকুয়ায় ৪৩টি। এবারের নির্বাচনে মোট বুথ সংখ্যা ৯৯১টি। পুরুষ বুথ ৪৯২টি এবং নারী বুথ ৪৯৯টি। একই দিনে গণভোট হওয়ায় বুথ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রবাসী আয় এই এলাকার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখানকার বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখনো আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিনত হয়েছে।
আগের নির্বাচনের ফল
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে এ আসনে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী হাসিনা আহমদ। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫১২ টি। ২০০১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ। আর ১৯৯১ সালে জয়ী হন জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু।
সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়নের পাশাপাশি তারা চান অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্ভীক ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক।
চকরিয়া উপজেলার কৃষক আব্দুর রহমান (৫২) বলেন, ‘উন্নয়ন চাই, তবে তার আগে চাই শান্তিপূর্ণ ভোট।’ পেকুয়া উপজেলার গৃহিনী রশিদা বেগম (৪৫) বলেন, ‘নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, কোনো চাপ ছাড়া।’
তরুণ ভোটার ও শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। জেলে, ব্যবসায়ী ও বয়স্ক ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও সামাজিক সুরক্ষা।
চকরিয়া কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমরা তরুণ প্রজন্ম শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে যেন চাকরির জন্য দূরে যেতে না হয়। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাটা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে আমাদের ভবিষ্যৎ আরও আশাব্যঞ্জক হবে।’
পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের বাসিন্দা তরুণ ভোটার আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখতে চাই। শুধু স্লোগান আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান উন্নত হলে তরুণরা নিজের এলাকায় ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা চাই অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ।’
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি
বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই তার প্রধান লক্ষ্য। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকীকরণ।’ তিনি বলেন, ‘এই এলাকা আমার চেনা। মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করেছি।’
অপরদিকে জামায়াত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল-ফারুক দুর্নীতিমুক্ত ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
তার অগ্রাধিকার–সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক সাশন ব্যবস্থা, যুবকদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতার নয়, আমানতের রাজনীতি করতে চাই। তরুনদের সামনে রেখে আগামীর সরকার গঠনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট অঙ্গিকার বদ্ধ।’
সব মিলিয়ে কক্সবাজার-১ আসনের নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করবে না, বরং জাতীয় রাজনীতির চলমান টানাপোড়েনের প্রতিফলনও ঘটাবে। এখন দেখার বিষয়–ভোটার উপস্থিতি, নির্বাচনের পরিবেশ ও প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতার বিচারে শেষ পর্যন্ত কার হাতে যায় চকরিয়া-পেকুয়ার প্রতিনিধিত্ব।


