সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল প্রবল, অক্টোবরে তা নিচ্ছে আরও ভয়াবহ রূপ। মাসের প্রথম দিকেই দেখা যাচ্ছে সেই ভয়াবহতার ছাপ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৪২ জন। এই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন। একদিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা চলতি বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেই মশাবাহিত এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে এবং মোট আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৫৬৫ জন।
ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশ এখন বড় একটি স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অক্টোবরে টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। ঝুঁকি থেকে যেতে পারে নভেম্বর পর্যন্ত।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি থামার পরও অন্তত দুই মাস ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকবে। কারণ বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এ রোগের বাহক এডিস মশা ডিম ফুটে বের হচ্ছে।’
বৃষ্টি থেমে গেলে তখনো ডিম ফোটার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে। এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২১২ জনের, এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে। চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল ২১ সেপ্টেম্বর। সেদিন ২৪ ঘণ্টায় এ রোগে প্রাণ হারায় ১২ জন। রোববারের নয়জনের মৃত্যু চলতি বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সেপ্টেম্বরে রেকর্ড ১৫ হাজার ৮৬৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে এই সময়ে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যেখানে ২৬ জন মারা গিয়েছিলেন, সেখানে শুধু সেপ্টেম্বরে প্রাণ হারান ৭৬ জন। এ তথ্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
আবহাওয়াই মূলত ডেঙ্গু পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হওয়ার কারণ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ বর্ষার উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। নগরে যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেখানেই এ মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।
গত ১ অক্টোবর ভারি বর্ষণ হয় ঢাকায়। সেদিনের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস ওয়েবসাইট মেটিওফর জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টি চলবে। এরপর কিছুদিন রোদ দেখা গেলেও ১৭ থেকে ৩০ অক্টোবর আবারও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, দুর্গাপূজার ছুটির পর (অক্টোবর ও নভেম্বর) সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘ছুটির সময়ে স্কুল, বাড়ি, অফিস ও আদালতে পানির পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। এগুলো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ। ছুটি শেষে মানুষ যখন ফিরবে, তখন এই জমে থাকা পানি বড় সংক্রমণের উৎস হয়ে উঠতে পারে।’
নাগরিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সুরক্ষিত থাকতে মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।’
যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা নিয়মিত ফগিং ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পর্যায়ে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
তাদের পরামর্শ, এখনই জরুরি ভিত্তিতে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে যতটা ভাবা হচ্ছে, অক্টোবরে তার থেকেও ভয়াবহ হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি।


