‘প্রিয়জন আমাকে প্রয়োজনের সময়ে পাননি। এখন বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। সন্তানরা আমার জামিন চান। কিন্তু আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বৃহস্পতিবার নিজের জামিনের আবেদন প্রত্যাহারের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি। প্রায় দুই বছর কারাবন্দিত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বামীর জীবনের শেষ সময়ে তার পাশে থাকতে পারিনি। গত ১৮ আগস্ট আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি তদন্তাধীন মামলায় নির্ধারিত তারিখে হাজির করা হলে বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারককে এসব কথা বলেন দীপু মনি। তার সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ মোট ১০ আসামিকে পুলিশ ট্রাইব্যুনালে হাজির করে।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেলে এদিন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানির একপর্যায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুমতি চান দীপু মনি। অনুমতি পেয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আইনজীবী জামিনের আবেদন করেছেন। আমি গত দুই বছর ধরে কারাগারে থাকলেও আদালতের সামনে কথা বলিনি। তবে আজ কিছু বলতে চাই।’
‘আমি এখন আর জামিন চাই না। আমার জামিন আবেদন প্রত্যাহার করছি,’ বলেন তিনি।
এরপর নিজের পারিবারিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে দীপু মনি বলেন, ‘আদালত এর আগে জামিনের সময় আমাকে প্রশ্ন করেছিল, “বাসায় গিয়ে কি করবেন?”’ দীপুর ভাষায়, ‘আপনাদের কথাই সত্যি হয়েছে।’
দীপু মনি বলেন, ‘আমার স্বামী সাত বছর ধরে অসুস্থ ও বাকরুদ্ধ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি চোখের ইশারায় কথা বলতেন। সরকারে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করার সময়ও আমি স্বামীকে আগলে রেখেছিলাম এবং তার যত্ন নিয়েছি। তখন তার কোনো সমস্যা হয়নি।’
‘কিন্তু গত দুই বছর ধরে আমি কারাগারে থাকায় তাকে বিভিন্ন অজ্ঞাত জায়গায় রাখা হয়েছে’, বলেন তিনি।
নিজের ৩৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের কথা উল্লেখ করে দীপু মনি বলেন, ‘আমি আমার ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর কাছে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্বামীর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি।’
এরপর আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ভালোবাসার মানুষ যখন আমাকে প্রয়োজনের সময়ে পাননি, এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমার সন্তানরা জামিন চায়। তবে আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই।’
দীপু মনির বক্তব্যের সময় আদালতকক্ষে নীরবতা নেমে আসে।
এরপর ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে বলা হয়, উই আর সাডেড। এরপর তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, ‘আপনি যা বলেছেন তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তবে জামিনের বিষয়ে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয় এবং উভয় পক্ষের বক্তব্যও ভাবতে হয়।’
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দীপু মনির জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। গত ১৮ আগস্ট স্বামী তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুর পর তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার দীপু মনি ব্যক্তিগতভাবে তার জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করতে চাইলেও ডিফেন্স আইনজীবীর সম্মতিতে আবেদনটি আপাতত পেন্ডিং রাখে ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।


