ব্রেক ফেল করা যাত্রীবোঝাই বাসের কারও কোনো ক্ষতি হতে দেননি তিনি। কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে চুকাতে হয়েছে দাম। ৩১ বছর বয়সী মো. দুলাল নামের এই মানুষের এমন আত্মত্যাগের মূল্য দেয়নি কেউ। স্ত্রী সন্তানের অনিশ্চিত জীবনে নেই কোনো আশার আলো। তার এই আত্মত্যাগের কথা জানতে পেরে স্থানীয় প্রশাসন যে সহায়তা দিয়েছে, তা দিয়ে পরিবারটির এক মাসের ওষুধের দামও মিটবে না।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ধলেশ্বরী টোল প্লাজায় প্রাণ হারান দুলাল। পুরো কাহিনিটি এক দিক দিয়ে হৃদয় বিদারক, আবার অন্যদিক দিয়ে মানুষ হিসেবে অসাধারণ দায়িত্ব পালনের নিদর্শন।
আহসান পরিবহনের যাত্রীভর্তি বাসটি ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় হঠাৎ ব্রেক ফেল করে। চালক কোনোভাবেই বাসটির নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই দুলাল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস থেকে নেমে যান। চলন্ত বাস থামানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি চাকার নিচে কাঠ বা ভারী কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু সেই সময় বাসের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। তার আত্মত্যাগের কারণেই বাসটি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং যাত্রীদের কেউ আহত হননি।
বাসে ছিল ৪০ জনের মতো মানুষ। তাদের যাত্রীদের জীবন বাঁচানো সেই দুলালের পরিবার এখন অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
দুলালের স্ত্রী মোছা. মুসলিমা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল দুলাল। আমাদের সন্তান জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। এরপর থেকেই আমি অসুস্থ। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। সংসারের সব খরচ দুলালই চালাত। এখন আমি কীভাবে চলব, জানি না।’
কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের কে জি পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি। তার জীবনটি জন্মের পর থেকেই ছিল কঠিন।
মাত্র তিন মাস বয়সে মাকে হারান দুলাল। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে বড় ভাই আমিনুর ইসলামের কাছে বেড়ে ওঠেন। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে জীবিকার তাগিদে পরিবহন শ্রমিকের কাজ শুরু করেন।
আমিনুর বলেন, ‘আমরা দুই ভাই একই বাড়িতে থাকতাম। গতকাল লাশ পেয়েছি, মাগরিবের নামাজের পর দাফন করেছি। ভাইটা চলে গেল। তার স্ত্রীকে মতো কেউ নেই। আমরা খুবই অসহায় পরিবার।’
বিপাকে পড়া শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে পরিবহন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হলেও দুলালের জন্য এখনো কোনো সহায়তা আসেনি।
যোগাযোগ করা কলে কুড়িগ্রামের উত্তর ধরলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি বশির আহমেদ বাঁশি বলেন, ‘আমরা দাফন হওয়া পর্যন্ত পাশে ছিলাম। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
আহসান পরিবহনের ভুরুঙ্গামারী কাউন্টার ম্যানেজার নুর আলম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর মরদেহ আনা, দাফন-কাফনসহ সব খরচ পরিবহনের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে। আমরা সবসময় পরিবারের পাশে আছি। পরিবারের সঙ্গে বসে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সোমবার মালিক সমিতির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেব নাথ দুলালের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সহায়তার সুযোগ থাকলে সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


