চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই কৃতি সন্তান দীর্ঘদিন ধরে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে আসছেন। শিবগঞ্জের কার্তিক পরামাণিক প্রায় সাত দশক ধরে বৃক্ষরোপণ করছেন। এদিকে ভোলাহাটের মো. জিয়াউল হক দই বিক্রির আয় দিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই বিতরণ, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও অসহায় মানুষের সহায়তা করে আসছেন।
একজন পেয়েছেন ২০০৬ সালের কৃষি পদক। অন্যজন ২০২৪ সালের একুশে পদক।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ মো. মোজাহারুল ইসলাম তরু বলেন, ‘মানুষের কল্যাণে কাজ করতে বড় কোনো পদ-পদবি বা সম্পদের প্রয়োজন নেই, তারা তা প্রমাণ করেছেন। তাদের বৃক্ষরোপণ, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কাজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য গর্বের। তাদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, ‘কার্তিক পরামাণিক ও মো. জিয়াউল হকের মতো মানুষ আমাদের জেলার গর্ব। তাদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।’
সাত দশকের বৃক্ষপ্রেম কার্তিকের
কার্তিক পরামাণিকের বৃক্ষপ্রেমের শুরু মাত্র ১০ বছর বয়সে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে চলার পথে বিস্তীর্ণ বালুচর ও ধুলার ঝড় দেখতেন। গাছপালা না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ তাকে ভাবিয়ে তুলত। বাবার কাছ থেকে গাছ লাগানোর উপকারিতা ও সওয়াবের কথা শুনে বৃক্ষরোপণে আগ্রহী হন তিনি।
বয়স এখন আশির কোঠা পেরিয়েছে। শরীরও আগের মতো সঙ্গ দেয় না। স্ত্রী গীতা রানী পরামাণিকের মৃত্যুও তাকে শোকাহত করেছে। পরিবারের সদস্যরা বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও বর্ষাকাল এলেই গাছের বীজ ও চারা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
রাস্তার পাশে, হাটবাজারে, ঈদগাহে, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনার আশপাশে তার লাগানো গাছ ছড়িয়ে আছে।
প্রতি বছর শতাধিক গাছ রোপণ করেন কার্তিক। কোনো কোনো বছর সংখ্যা ১৫০ থেকে ২০০ ছাড়ায়। শুধু চারা রোপণ নয়, নিজের নার্সারিতে চারা তৈরিও করেন তিনি।
২০০৩ সালের ২ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে তার বৃক্ষরোপণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। ২০০৬ সালে পান কৃষি পদক।
পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কী চান। নিজের সুবিধার কথা না বলে রাস্তা পাকা করার দাবি জানান কার্তিক। পরে ২০০৭ সালে মনাকষার হঠাৎপাড়া থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়। গোপালপুর ঘাটে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে আছে।
২০১৩ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে ‘আ ম্যান হু লাভস ট্রিজ’ শিরোনামে তাকে নিয়ে একটি গল্প প্রকাশিত হয়।
কার্তিকের ছোট ছেলে সনাতন পরামাণিকও বাবার সঙ্গে বৃক্ষরোপণের কাজে যুক্ত। কার্তিকের ইচ্ছা, তিনি না থাকলেও যেন এই কাজ চালিয়ে যান সনাতন। বাবার সেই ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কার্তিক পরামাণিক বলেন, ‘যখন দেখি মানুষ গাছের ছায়ায় বসে স্বস্তি পাচ্ছে, পাখিরা গাছে বসে গান করছে, মা পাখি তার ছানাকে খাবার খাওয়াচ্ছে, তখন আমার খুব ভালো লাগে।’
এসব দৃশ্য মানুষের মধ্যে মাতৃত্ববোধ ও মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলবে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি।
দই বিক্রির আয় দিয়ে জিয়াউলের সমাজসেবা
ভোলাহাটের মো. জিয়াউল হকের সমাজসেবার শুরু নিজের বঞ্চনা থেকে। ১৯৫৫ সালে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর অর্থের অভাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারেননি তিনি।
তার বাবা তৈয়ব আলী মোল্লা বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দোহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছেলের পড়াশোনার বই-খাতা ও ভর্তি খরচ জোগাড় করাও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার পর বাবার কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে দই তৈরি ও বিক্রি শুরু করেন জিয়াউল। নিজের শিক্ষাজীবনের কষ্ট ভুলে যাননি। টাকার অভাবে যেন অন্য কারও পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেই সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
১৯৬০ সাল থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া শুরু করেন। দই বিক্রির আয় থেকে টাকা জমিয়ে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের বই সংগ্রহ করতে থাকেন। পরে নিজের বাড়ির একটি কক্ষে বই রাখার ব্যবস্থা করেন।
১৯৬৯ সালে বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জিয়াউল হক সাধারণ পাঠাগার’। সময়ের সঙ্গে সেখানে হাজার হাজার বই জমা হয়। একপর্যায়ে বইয়ের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়ায়। জায়গার সংকটে পাঠাগারের কিছু বই আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারেও রাখা হয়েছে।
অসহায় মানুষের ঘর নির্মাণে সহায়তা, নলকূপ স্থাপন, খাদ্য ও পোশাক বিতরণ, এতিমদের সহযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই দেওয়া ও শিক্ষার্থীদের বেতন পরিশোধসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজেও অর্থ ব্যয় করেছেন জিয়াউল।
তার কাছ থেকে বই ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরে শিক্ষক, চাকরিজীবী ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে একুশে পদক নেওয়ার পরদিনও জিয়াউলকে রহনপুর স্টেশন বাজারে দই ও ক্ষীর বিক্রি করতে দেখা যায়। শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফুল নিয়ে তার বাড়িতে গেলেও জীবিকার প্রয়োজনে তিনি তখন বাজারে ছিলেন।
জিয়াউল বলেন, ‘আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ পাইনি। জীবনে শিক্ষার যে ঘাটতি ছিল, তা সবসময় অনুভব করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি, শিক্ষার আলো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় ও দরিদ্র ছেলে-মেয়েরা যেন বই পড়ার সুযোগ পায়, জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, এটাই আমার মূল উদ্দেশ্য।’


