রাজশাহী শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে কিংবা পুরোনো গলির মোড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর কংক্রিটের ‘ঢোপকল’গুলো শুধু প্রাণহীন স্তম্ভ নয়। এগুলো শহরের আবেগ, ঐতিহ্য এবং সেই পরিচিত আশ্রয়, যা একসময় হাজারো মানুষের তৃষ্ণা মিটিয়েছে। কিন্তু আজ অবহেলার কারণে সেই গৌরবময় ইতিহাস ধুঁকছে। এগিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে। যে হাতল একসময় বিশুদ্ধ পানি তুলে পথিকের ক্লান্তি ও তৃষ্ণা দূর করত, আজ সেগুলো পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনা ও ধুলোর আধারে।

রায় বাহাদুর কুঞ্জবিহারী ওরাঁওয়ের দূরদর্শী চিন্তায় ১৯৩৭ সালে গড়ে ওঠা এই বৈপ্লবিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আজ জরাজীর্ণ, শ্যাওলায় আচ্ছাদিত হয়ে প্রায় ধ্বংসের পথে। স্তম্ভগুলোর গায়ে জমে থাকা ময়লার স্তর, ভাঙা আবরণের পেছনে ঝুলে থাকা পুরোনো পোস্টার এবং উপচে পড়া আবর্জনার দুর্গন্ধ যেন রাজশাহীর ইতিহাসকে নীরবে কাঁদায়। বিশুদ্ধ পানির পরিবর্তে এগুলোর চারপাশে জমে থাকে নোংরা পানি ও রোগজীবাণু বর্তমান বাস্তবতার এক করুণ চিত্র।
একসময় ঢোপকল ছিল জনকল্যাণের প্রতীক। এটি ছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি ছিল শহরের পরিচিত ল্যান্ডমার্ক, মানুষের মিলনস্থল এবং নগরজীবনের নীরব সঙ্গী। আজ এই ঢোপকল অবহেলার স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে এর ঐতিহ্য।

একটি শহরের পরিচয় তার ঐতিহ্যকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই শহর এখন নিজের ইতিহাসের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং নিজের শিকড়কেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই প্রত্নঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে রাজশাহীর আত্মার একটি অংশ হারিয়ে ফেলা।
প্রশাসন কি ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, নাকি শহরের মানুষ জেগে উঠে এই পানিহীন অবহেলিত স্মৃতিচিহ্নগুলো রক্ষায় এগিয়ে আসবে?! এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে–রাজশাহী তার অতীতকে মনে রাখবে, নাকি একদিন তা পুরোপুরি ভুলে যাবে।


