শামীম ওসমানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে গোলাগুলি হয়, সাক্ষীর জবানবন্দি

শামীম ওসমানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে গোলাগুলি হয়, সাক্ষীর জবানবন্দি
শামীম ওসমান। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া ও জালকুড়ি এলাকায় শামীম ওসমানের নেতৃত্বে গোলাগুলি হয়েছে এবং এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন; আদালতে এমন অভিযোগ করেছেন দুজন সাক্ষী।

সাক্ষী মাহমুদ হোসেন ও মো. স্বাধীন মিয়া ওই দিনের আন্দোলন ও গোলাগুলির বর্ণনা দেন। অপর সাক্ষী মোশারফ ব্যাপারী তার ছেলে রাকিবের ২১ জুলাই সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তিন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে।

শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। ট্রাইব্যুনালে এর আগে দেওয়া সাক্ষ্যেও নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের ওপর শামীম ওসমান ও তার সহযোগীদের নেতৃত্বে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ এসেছে।

৬০ বছর বয়সী মাহমুদ হোসেন ঠিকাদার এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি। পাশাপাশি তিনি বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-শ্রমিক হত্যার বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে তিনি ট্রাইব্যুনালে এসেছেন বলে জানান।

মাহমুদ বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের হামলার দৃশ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি।

এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং পরে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে গোলাগুলি শুরু হয়। রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর আমরা ছাত্রদের পক্ষে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, জালকুড়ি লিংক রোড ও নারায়ণগঞ্জ সদরে তারা আন্দোলন গড়ে তোলেন। এতে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু হাসান টিপু গুলিবিদ্ধ হন এবং তিনি নিজে টিয়ার শেলের আঘাতে আহত হন।

১৯ জুলাইয়ের গোলাগুলি

মাহমুদ হোসেন বলেন, ১৯ জুলাই শামীম ওসমানের নেতৃত্বে চাষাঢ়া ও জালকুড়ি এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এতে আদিল ও ইয়াছিনসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় আনুমানিক দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে বলে তিনি জানান। ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ডিআইটি রোডে রিয়াগোপ নামে একটি শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মাহমুদ।

সেদিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেখিয়েছেন।

মাহমুদ জবানবন্দিতে যাদের গুলি করার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, অয়ন ওসমান, তানভীর মোহাম্মদ টিটু, ভিকি, আজমেরী ওসমান, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ, ছাত্রলীগ নেতা সোহানুর রহমান শুভ, শ্রমিকলীগ নেতা কাওছার আহমেদ পলাশ, শ্রমিকলীগ নেতা সবুজ শিকদার ও শ্রমিকলীগের সদস্য সবুজের নাম বলেন।

এ ছাড়া ছাত্রলীগ ও শ্রমিকলীগের আরও অনেক নেতাকর্মী সেখানে ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। মাহমুদের জবানবন্দিতে ৪ আগস্ট চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার কথাও আসে।

তিনি বলেন, সেদিন সেখানে পুলিশসহ তার উল্লেখ করা ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। টিয়ারশেলের আঘাতে তার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন

বদিউজ্জামানকে মারধরের অভিযোগ

মাহমুদ জানান, ৫ আগস্ট প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে তারা দলীয় কার্যালয় থেকে কালী বাজার হয়ে কুমুদিনীর দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন বিটিভি সাংবাদিক হেলাল তাদের সতর্ক করে বলেন, ওই দিকে না যেতে; সেখানে শামীম ওসমান দলবল ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছেন।

পরে মিশনপাড়া মোড়ে জমায়েত হয়ে তারা চাষাঢ়ার দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে শামীম ওসমানের লোকজন তাদের কর্মী বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায় বলে মাহমুদ দাবি করেন। শহীদ মিনার মোড়ে তারা বদিউজ্জামানকে লোহার রড, পাইপ ও গাছের ডাল দিয়ে মারধর করতে থাকেন বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।

মাহমুদ জানান, সেখানে শামীম ওসমানকে ‘মার মার’ বলতে দেখেন তিনি। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, সবুজ শিকদার, রিয়াদ, শুভ, শফিক, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, রুস্তম, তানভীর মোহাম্মদ টিটু ও চুন্নু মাস্টারসহ আরও অনেকে বদিউজ্জামানকে মারধর করছিলেন।

কবির নামে একজন বদিউজ্জামানের মোবাইল ফোন নিয়ে যান বলেও তিনি দাবি করেন। বদিউজ্জামানকে উদ্ধারের সময় তাকেও মারধর করা হয় এবং তার মাথা ফেটে যায় বলে মাহমুদ জানান। পরে আহত বদিউজ্জামানকে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে ছয় জায়গায় বাধা দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ।

মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে তারা হাসপাতালে পৌঁছান। হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে শামীম ওসমানের লোকজন তাদের বাধা দেয়।

চুন্নু নামে একজন রক্তাক্ত বদিউজ্জামানকে ভ্যান থেকে লাথি মেরে ফেলে দেন বলেও তিনি দাবি করেন। পরে তারা আরও লোকজন নিয়ে হাসপাতালে ফিরে গেলে চিকিৎসক বদিউজ্জামানকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্বাধীনের জবানবন্দি

২৯ বছর বয়সী মো. স্বাধীন মিয়া ট্রাইব্যুনালে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন। তার মামাতো ভাই বদিউজ্জামান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে নিহত হন।

স্বাধীন জানান, ১৯ জুলাই মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে তারা জালকুড়িতে আন্দোলনে অংশ নেন। তার দাবি, সেদিন শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, টিটু, ভিকি, ছাত্রনেতা শুভ এবং ছাত্রলীগের আরও অনেকে অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। এতে অনেক মানুষ আহত ও নিহত হন বলে তিনি জানান। নিহতদের মধ্যে আদিল ও ইয়াছিনের নাম উল্লেখ করেন তিনি।

৪ আগস্ট চাষাঢ়ায় আন্দোলনে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, ভিকি, টিটু, সাংবাদিক রাজু আহমেদসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে বলেও স্বাধীন দাবি করেন। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় আবু হাসান টিপু ছররা গুলিতে আহত হন এবং মাহমুদ হোসেন টিয়ার শেলের আঘাতে আহত হন।

৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনায় স্বাধীন বলেন, মিছিল নিয়ে চাষাঢ়ার দিকে যাওয়ার সময় তাদের একজন সাংবাদিক সতর্ক করে বলেন, সামনে শামীম ওসমানের লোকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে। পরে শামীম ওসমান ও তার লোকজন চলে যাওয়ার পর তারা আবার চাষাঢ়ার দিকে যান।

স্বাধীন দাবি করেন, কালীবাজার ২ নম্বর গেটের দিকে যাওয়ার সময় মিছিলের পেছন থেকে তার মামাতো ভাই বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায় শামীম ওসমানের লোকজন।

পরে তারা গিয়ে বদিউজ্জামানকে মারধর করতে দেখেন। তার জবানবন্দিতে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, ভিকি, শামীম ওসমান, টিটু, সবুজ শিকদার ও চুন্নুসহ আরও কয়েকজনের নাম আসে।

স্বাধীন জানান, আহত বদিউজ্জামানকে উদ্ধার করে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে চার-পাঁচ জায়গায় তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। বিকাল আনুমানিক ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর হাসপাতালের গেটেও তাদের বাধা দেওয়া হয়।

চুন্নু ও সবুজ শিকদার বদিউজ্জামানকে ভ্যান থেকে লাথি দিয়ে ফেলে দেন বলে তিনি দাবি করেন। পরে বিকাল আনুমানিক ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার দিকে তারা আবার হাসপাতালে গিয়ে বদিউজ্জামানকে পড়ে থাকতে দেখেন। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে স্বাধীন জানান।

রাকিব হত্যার বর্ণনা বাবার জবানবন্দিতে

সাক্ষী মোশারফ ব্যাপারীর ছেলে রাকিব ২০২৪ সালের ২১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

৬০ বছর বয়সী মোশারফ জানান, দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তার ছেলের নম্বর থেকে ফোন করে রাকিবের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ছেলেকে নিয়ে খানপুর হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মোশারফ বলেন, ছেলের লাশ লালপুরের বাড়িতে নেওয়ার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের বাধা দেয়। পরে আমি লাশ নিয়ে বরিশালের গ্রামের বাড়িতে চলে যান এবং ২২ জুলাই সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাকিবকে দাফন করেন।

জবানবন্দিতে মোশারফ জানান, তিনি শুনেছেন শামীম ওসমানের ছেলে, ভাতিজা ও আওয়ামী লীগের লোকজন তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছেন।

মোশারফের ছেলে রাকিব সংসারের উপার্জন করতেন এবং তার আরেক ছেলে প্রতিবন্ধী।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad