নগরজুড়ে মশা মারার প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও চট্টগ্রামজুড়ে কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২৬ দিনেই চট্টগ্রামে ২ হাজার ৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যা গত আগস্ট মাসের মোট আক্রান্তের চেয়ে ৮৩৫ জন বেশি।
মশা নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচির কিন্তু কোনো কমতি নেই। সকালে মশার লার্ভা মারার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, বিকালে দেওয়া হচ্ছে ধোঁয়া (ফগিং)। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে, বসানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত, আর সেই সঙ্গে চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযানও।
তা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতেই লুকিয়ে আছে এডিস মশার লার্ভা। এই হার স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট, শহরের আনাচে-কানাচে মশার প্রজননক্ষেত্রগুলো আগের মতোই বহাল রয়েছে। আসল সমস্যা হলো প্রশাসন যেখানে ধোঁয়া দিয়ে উড়ন্ত মশা মারার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে, সেখানে মশার ডিম ও লার্ভা তৈরির আসল কারখানা অর্থাৎ জমে থাকা পানি অধরাই থেকে যাচ্ছে।
তা ছাড়া ঘন ঘন বৃষ্টি আর নতুন নতুন ভবন নির্মাণের ফলে প্রতিনিয়ত জমা পানিতে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজননক্ষেত্র। কিন্তু পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অভিযান চালানোয় অনেক নতুন জায়গা নজরের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠা, সাধারণ মানুষের উদাসীনতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতাও এই অভিযানগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
চলতি বছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৭ জনে। এর মধ্যে ৫ শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ২২৭ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, বারবার অভিযানের পরও মশার প্রজনন কেন্দ্রগুলো মোটেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
সবাই জানে এডিস মশা ডিম পাড়ে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে। তাই শুধু উড়ন্ত মশা মেরে লাভ নেই, মশার উৎস বা ডিম পাড়ার জায়গাগুলো ধ্বংস করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কিন্তু শহরজুড়ে সেই কাজটি কতটুকু সঠিকভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দাবি, ৪১টি ওয়ার্ডেই সকালে লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ এবং বিকালে মশা মারার ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে। হটস্পটগুলোতে চলছে বিশেষ অভিযান।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বাসাবাড়ির ছাদ, টব, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা ছোট ছোট নালায় জমে থাকা পানিতে এখনও দিব্যি বংশবৃদ্ধি করছে এডিস মশা। অর্থাৎ উৎস বহাল রেখেই ওপর দিয়ে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
এমন অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অভিযান চালানোর কারণে মশক নিধন কার্যক্রম বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
চলতি বছর চট্টগ্রামে ২০টি এলাকাকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোট আক্রান্তের প্রায় ২ হাজার ৩০০ জনই এসব এলাকার। এমনকি মারা যাওয়া ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন এসব এলাকার বাসিন্দা।
হালিশহর, বন্দর, পাহাড়তলী, বাকলিয়া, কোতোয়ালি, সদরঘাট ও পাঁচলাইশ–এসব এলাকা এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আর উপজেলার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী মিলছে সীতাকুণ্ডে।
তবে মশার উপদ্রব কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে না। বৃষ্টি, নির্মাণকাজ বা পানি জমার নতুন জায়গা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও বদলে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি পুরোনো হিসাব ধরে অভিযান চালায়, তবে নতুন তৈরি হওয়া মশার প্রজননক্ষেত্রগুলো অভিযানের বাইরেই থেকে যায়।
আগের বিভিন্ন গবেষণাতেও চট্টগ্রামে লার্ভার ঘনত্ব বাড়ার প্রমাণ মিলেছে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, শহরে লার্ভার হার ২০২৪ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ২০২৬ সালে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলোর ওপরও প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। যেমন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪০ শয্যার ডেঙ্গু ইউনিটে একপর্যায়ে ৭১ জন রোগীকে ভর্তি রাখা হয়েছিল। শয্যা না পেয়ে অনেককে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের মৃত্যুমিছিল পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি মাসের ২৬ দিনেই মারা গেছেন ১৪ জন, যার মধ্যে ৫ জনই শিশু। আর এ বছর মোট আক্রান্তের মধ্যে ৯০৭ জনই শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালের শয্যা বা চিকিৎসা বাড়িয়ে ডেঙ্গু আটকানো যাবে না। রোগী যেন হাসপাতালেই না পৌঁছায়, অর্থাৎ মশার কামড় ও বংশবৃদ্ধি শুরুতেই থামাতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল মশা মারার বিষয় নয়; এটি পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত।
সিটি করপোরেশন বলছে, তারা নিয়মিত ওষুধ ছিটাচ্ছে। জেলা প্রশাসন বলছে, অভিযান আরও জোরদার করা হবে। আর স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, তারা চিকিৎসার প্রস্তুতি রাখছে।
আসল প্রশ্ন হলো এসব অভিযানের ফল কী?
কত লিটার ওষুধ ছিটানো হলো বা কত জায়গায় ফগিং হলো, তা দিয়ে সফলতার বিচার হয় না। সফলতা বিচার করতে হবে তখন, যখন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমবে এবং লার্ভার উপস্থিতি শূন্যে নেমে আসবে।
যদি প্রতি ৪টি বাড়ির ১টিতে লার্ভা মেলে এবং ওষুধ ছিটিয়েও রোগী বাড়তেই থাকে, তবে ব্যর্থতার দায় কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল টাইমসকে জানান, প্রতিবছর একই ওষুধ ব্যবহার করলে মশা তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মশা ওষুধ সহ্য করতে পারছে কি না, কোন ওষুধে কাজ হচ্ছে—তা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি কেবল বড় ড্রেন নয়, বাসাবাড়ির পাশের ছোট নালাগুলো পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভবন মালিকদের সম্পৃক্ত না করলে সরকারি কোনো অভিযানেই স্থায়ী সুফল আসবে না বলে মনে করেন তিনি।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ড. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।


