ঢোলের তালে তালে মাঝিদের হাঁকডাক। নদীর বুকে ছুটছে রঙিন নৌকা। বৈঠার প্রতিটি টানে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। দুই পাড়ে হাজারো দর্শকের করতালি আর উচ্ছ্বাস। এমন দৃশ্যেই শনিবার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের কালীগঙ্গা নদী।
ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন মানুষ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, সব বয়সী মানুষ ছিলেন দর্শকের সারিতে। কেউ বাড়ির ছাদে, কেউ গাছের ডালে, আবার কেউ ট্রলার ও ডিঙি নৌকায় বসে উপভোগ করেন গ্রামবাংলার এই চিরচেনা আয়োজন।
শনিবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উপজেলার জামশা ইউনিয়নের মাটিকাটা গোলাই-বালুরচর এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে বসে এই নৌকাবাইচের আসর। সিংগাইরের বিভিন্ন এলাকা ও ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে আসা ১০টি সুসজ্জিত নৌকা এতে অংশ নেয়।
পাঁচ ধাপে চলে প্রতিযোগিতা। প্রতিটি ধাপেই ছিল উত্তেজনা। ঢোলের বাদ্য আর মাঝিদের ছন্দময় হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে নদী। নৌকাগুলো একে অপরকে পেছনে ফেলতে ছুটলে দুই পাড়ের দর্শকের করতালি বাড়িয়ে দেয় প্রতিযোগীদের উৎসাহ।
চূড়ান্ত পর্বে মুখোমুখি হয় কসাইবাড়ি ও মাসুদ রানা নৌকা। শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে চলে তীব্র লড়াই। শেষ পর্যন্ত বৈঠার ছন্দ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয় কসাইবাড়ি। রানার্সআপ হয় মাসুদ রানা।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল পেয়েছে মোটরসাইকেল। পরবর্তী বিজয়ী দলগুলোকে দেওয়া হয়েছে চারটি ফ্রিজ, টিভিসহ বিভিন্ন পুরস্কার।
দক্ষিণ মাটিকাটা গ্রামের উদ্যোগে গোলাই, জামশা, বাস্তা, সারারিয়া, দাড়িপাড়া ও বরন্ডি গ্রামের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়।
নটর ডেম কলেজের প্রভাষক উমর আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কাজী ইয়াকুব হোসেন রাজা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন্নাহার পপি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল আমিন কবির, সিংগাইর থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
আয়োজকদের বলেন, ‘নৌকাবাইচ বাংলার নদীমাতৃক সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ।’ এমন আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি পরিচিত হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
তবে উৎসবের মাঝেও অভিযোগ রয়েছে। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, বিত্তশালী দর্শকদের স্পিডবোট চলাচলে নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
কালীগঙ্গার ঢেউ, বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে দিনভর যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল, তাতে আবারও সামনে আসে নদী ও নৌকাকে ঘিরে বাংলার পুরোনো লোকজ ঐতিহ্যের শক্ত বন্ধন।


