নীলফামারীর ডোমারের পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়ায় প্রতিদিন ভোর হয় পাখির কলকাকলিতে। ভোরের আলো ফুটতেই চারদিক থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক। বাঁশঝাড়ের এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে বেড়ায় বক, দোয়েল, শালিক, ঘুঘুসহ নানা পাখি। কেউ খাবারের সন্ধানে ছুটছে, কেউ আবার ডালে বসে ডাকছে সঙ্গীকে। সব মিলিয়ে মনে হয়, এটি যেন কোনো পাখির অভয়ারণ্য। অথচ চারপাশে মানুষের বসতি।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সীমান্তবর্তী চিলাহাটির পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের চিত্র এটি। শত বছরের বেশি সময় ধরে একটি বাঁশঝাড়কে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে পাখিরা। দীর্ঘদিনের এই পাখির বসতিই বদলে দিয়েছে গ্রামের পরিচয়। পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া এখন স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘পাখির গ্রাম’ নামে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে পাখি দেখতে আসেন।
জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দূরে চিলাহাটি। সেখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পেরোলেই দেখা মেলে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের। গ্রামের এক প্রান্তে প্রায় ২০ শতক জায়গাজুড়ে রয়েছে বিশাল বাঁশঝাড়। আর সেই বাঁশঝাড়ই বছরের পর বছর ধরে হয়ে উঠেছে নানা পাখির নিরাপদ আশ্রয়।
এই বাঁশঝাড়টির মালিক তিন ভাই রফিকুল ইসলাম, মজিদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম। তারা জানান, তাদের দাদার সময় থেকেই এই বাঁশঝাড়ে পাখির আনাগোনা। সময়ের সঙ্গে বাঁশঝাড় বড় হয়েছে, পাখিরাও এখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে। তিন ভাইয়ের ভাষ্য, একসময় পাখির সংখ্যা আরও বেশি ছিল। নানা কারণে এখন আগের তুলনায় পাখির আনাগোনা কমেছে। তারপরও প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় অসংখ্য পাখির সমাগম হয় এখানে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই বাঁশঝাড়টি সংরক্ষণ করে আসছে। পাখিদের জন্য জায়গাটি নিরাপদ রাখতে তারা সচেষ্ট। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে বাঁশঝাড় ও এর আশপাশের এলাকা আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে পাখির কলকাকলিতে। সকালে বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়ালে একসঙ্গে শোনা যায় অসংখ্য পাখির ডাক। কখনো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে, আবার কখনো বাঁশের ডালে বসে আছে সারি সারি পাখি। এই দৃশ্য এখন শুধু স্থানীয়দের নয়, আকৃষ্ট করছে বাইরের মানুষকেও। পাখিপ্রেমী দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন এই গ্রামে। কেউ পাখির ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অনন্য দৃশ্য।
একজন দর্শনার্থী বলেন, লোকালয়ের মধ্যে এমন বিপুলসংখ্যক পাখির বসতি সত্যিই চমৎকার। জায়গাটি পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দর্শনার্থীদের জন্যও আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।
আরেক দর্শনার্থীর মতে, শুধু পাখি সংরক্ষণ করলেই হবে না, জায়গাটির পরিবেশও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
পাখির এমন অবাধ বিচরণ আনন্দ দিলেও স্থানটি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা এবং এর সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে দর্শনার্থীদের মধ্যে।
বাঁশঝাড়ের নিচে পাখির বিষ্ঠা জমে থাকে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকলে সেখান থেকে দুর্গন্ধ ও জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাই পাখিদের আবাসস্থল নষ্ট না করে পরিকল্পিতভাবে জায়গাটির পরিচর্যা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি তাদের।
ডোমার উপজেলা প্রশাসনও পাখির এই আবাসস্থল সংরক্ষণে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, শত বছরের বেশি সময় ধরে পাখিরা এখানে আশ্রয় নিয়ে থাকলে জায়গাটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নিয়ে পাখির আবাসস্থলটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
একটি বাঁশঝাড়কে ঘিরে শত বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা পাখিদের এই বসতি এখন পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়ার আলাদা পরিচয়। পাখিদের উপস্থিতির কারণে বদলে গেছে গ্রামের পরিচিতি, তৈরি হয়েছে মানুষের আগ্রহ। তবে শুধু পরিচিতি পেলেই এই ঐতিহ্য টিকবে না। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।
পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়ার ‘পাখির গ্রাম’ তাই এখন শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। সম্মিলিত উদ্যোগে সংরক্ষণ করা গেলে এই পাখির আবাসস্থল হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের একটি আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক স্থান।


