বজ্রপাত থেকে কৃষকদের প্রাণ বাঁচাতে ঝিনাইদহে অভিনব উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন জহির রায়হান। বৃক্ষপ্রেমী ও জাতীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় রোপন করেছেন অন্তত আট হাজার তালের বীজ। বজ্রপাত প্রতিরোধে তাল গাছের অনন্য অবদানের বিষয়টি জানার পর থেকেই তিনি এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণ সড়কের দুই ধারে তিনি নিজ উদ্যোগে তাল বীজ রোপণ করে চলেছেন।
পরিবেশ সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মী জহির রায়হান ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামনগর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় রঙমিস্ত্রি জহির রায়হান তার আয়ের একটি অংশ দিয়ে রাস্তার ধারে তাল বীজ, খেজুর গাছের চারাসহ নানা জাতের গাছের চারা রোপণ করেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি নিজে থেকে কোনো সরকারি সহায়তা ছাড়াই এই অভিনব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছেন। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এমন অভিনব কাজের কারণে তিনি এরই মধ্যে একাধিক জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
সবশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের চন্ডিপুর-বেড়াশুলা মাঠে প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কে তালের বীজ রোপণ করেন জহির রায়হান।
অভিনব এই উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মীরা জানান, ঝিনাইদহ সদর জেলায় গত ছয় মাসে অন্তত ১২ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের অধিকাংশই কৃষক। মাঠে কাজ করার সময় কৃষকরা বজ্রপাতের শিকার হন। বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বজ্রপাত রোধে গ্রামীণ সড়কের ধারে তাল বীজ রোপণের পরিকল্পনা করেন জহির রায়হান। এরপর গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সংগ্রহ করেন তাল বীজ। পরে সেই বীজ বিভিন্ন রাস্তার ধারে রোপণ করেন তিনি।
রায়হানের এই কাজে তার পেশাগত সহকর্মীরা সহযোগিতা করেন। এ ছাড়া সমাজের সচেতন নাগরিক, শিক্ষক ও তরুণ সেচ্ছাসেবকরাও তার এই কাজে সহযোগিতা করেন।
পরিবেশ কর্মী জহির রায়হান বলেন, ‘বজ্রপাতের জন্য ঝিনাইদহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। প্রতি বছর গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন কৃষক বজ্রপাতে মারা যান। বিষয়টি নিয়ে আমি চিন্তা ভাবনা করে গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে তাল বীজ রোপণের সিদ্ধান্ত নিই। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে অন্তত আট হাজার তাল বীজ বপন করেছি। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে আমি নিয়মিত বিভিন্ন সড়কের পাশে তাল বীজসহ অন্যান্য গাছ রোপণ করি। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকার পাশাপাশি সড়কের সৌন্দর্য্যও বাড়ছে।’
এদিকে গত ৯ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের চন্ডিপুর-শংকরপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ফসলী মাঠের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সড়কের দুই ধারে দলবেঁধে তাল বীজ রোপণ করছেন জহির রায়হান। স্থানীয় তরুণ, কিশোর ও বয়স্কসহ নানা বয়সের মানুষ তালের বীজ রোপণে তাকে সহায়তা করছেন। কেউ কাঠি দিয়ে গাছ রোপণের সঠিক দুরত্ব পরিমাপ করছেন, কেউবা কোদাল হাতে মাটি খুঁড়ে গর্ত করছেন। আর সেসব গর্তে নিজ হাতে তাল বীজ রোপণ করছেন জহির রায়হান। সড়কের তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব তাল বীজ পোঁতা হয়।
পথচারী একরামুল কবির বলেন, বৃক্ষনিধনের এই যুগে জহির রায়হানের মতো মানুষ কমই আছে। তিনি এক দারুণ দৃষ্টান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এবং সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে জহির রায়হানের এই মহতী উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়।
স্থানীয় সমাজসেবক নাহিদ হোসেন বলেন, আজকে রোপণ করা তাল বীজ একসময় বড় গাছে পরিণত হবে। কৃষকরা ছায়া পাবে, ফল ও তালের রস সংগ্রহ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, কৃষকরা মাঠে কাজ করার সময় এই তাল গাছের কারণে বজ্রপাত থেকেও রক্ষা পেতে পারে।
পরিবেশকর্মী জহির রায়হান আরও বলেন, ‘আমার একটাই লক্ষ্য, বজ্রপাতে যেন আর কোনো কৃষকের প্রাণহানি না হয়। কৃষকরাই আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণ। কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের গাছ লাগানোর মাধ্যমে পরিবেশের সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। সবার উচিত প্রকৃতি, সমাজ, মানুষ ও দেশের জন্য কাজ করা।’


