একসময় শালবন, কৃষিজমি আর গ্রামীণ জনপদের জন্য পরিচিত ছিল গাজীপুর। ভাওয়াল রাজপরিবারের ঐতিহ্য আর সবুজ প্রকৃতির আবরণে ঢাকা এই জনপদ সময়ের স্রোতে বদলে গেছে। এখন সেই গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। লাখো মানুষের শ্রম, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও শিল্পকারখানার বিস্তারে ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী জনপদ আজ পরিচিত শিল্পনগরী হিসেবে।
গাজীপুরের শিল্পায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী অবস্থান। ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজে পণ্য পরিবহন এবং বিপুল শ্রমশক্তির কারণে শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে গাজীপুর দ্রুত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আশির দশক থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপনের গতি বাড়তে থাকে।
টঙ্গী, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, সিরামিক, খাদ্য, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় গাজীপুরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে।
শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যায় মানুষের জীবনযাত্রাও। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ গাজীপুরে আসতে শুরু করেন। এসব কারখানা ঘিরে গড়ে ওঠে আবাসিক এলাকা, বাজার, পরিবহন ও নানা ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। একসময় যেখানে কৃষিজমি ও বনভূমিই কেবল চোখে পড়ত, এখন সেখানে দেখা যায় শিল্পকারখানা ও ব্যস্ত নগরজীবন।
গাজীপুরের শিল্পায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি পোশাক খাত। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে গাজীপুরের কারখানাগুলোর বড় অবদান রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত লাখো শ্রমিকের শ্রম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নানা কর্মযজ্ঞ।
তবে গাজীপুরের শিল্পায়ন শুধু পোশাকশিল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ, সিরামিক, খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক, প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কালিয়াকৈরে প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ফলে গাজীপুর ক্রমেই বহুমুখী শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গাজীপুরের মানুষের শ্রম। কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী—সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন এই শিল্পনগরী। তাই স্থানীয়দের অনেকের মুখেই শোনা যায়, ‘আমরা গাজীপুরের মানুষ—শ্রম দিই, উৎপাদন করি, অর্থনীতির চাকা ঘুরাই।’
গাজীপুরের ইতিহাসের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিকভাবে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ পৃথক জেলা হিসেবে গাজীপুরের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ, শিক্ষা ও শিল্পখাতে উন্নয়নের মাধ্যমে জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
বর্তমানে গাজীপুরে রয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেলার জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, রাজবাড়ি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা গাজীপুরের অতীত ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করছে।
তবে দ্রুত শিল্পায়নের সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা সংকটও। কৃষিজমি ও জলাশয় কমে যাওয়া, শিল্পবর্জ্য, বায়ুদূষণ, যানজট, অপরিকল্পিত আবাসন এবং বনভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা না হলে ভবিষ্যতে এর বিরূপ প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাই এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত শিল্পায়ন। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, জলাশয় ও কৃষিজমি রক্ষা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
যে জনপদ একসময় পরিচিত ছিল শালবন আর ভাওয়াল রাজাদের ইতিহাস দিয়ে, সেই গাজীপুর আজ পরিচিত মানুষের শ্রম, শিল্প ও উৎপাদনের শক্তিতে। টাকা আর শিল্প তৈরির এই সক্ষমতাই গাজীপুরকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে।
এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া টাইমসকে বলেন, ‘ভাওয়ালের ঐতিহ্য থেকে আধুনিক শিল্পনগরী–গাজীপুরের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রারই একটি প্রতিচ্ছবি। একদিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য, অন্যদিকে শিল্প ও কর্মসংস্থান–দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠছে নতুন গাজীপুর।’
তিনি বলেন, গাজীপুরের শিল্পকারখানার মালিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে শিল্পমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। গাজীপুরের গার্মেন্টস খাতকে আরও শক্তিশালী করে দেশি-বিদেশি বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, গাজীপুরের শিল্প খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে গাজীপুরকে আরও সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও মেয়র মজিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ভাওয়ালের জনপদ থেকে ধীরে ধীরে আমাদের গাজীপুর শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্পায়ন শুধু গাজীপুরের অর্থনীতিই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের দাবি–গাজীপুরে যে শিল্পায়ন গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে না যায়। শিল্পকারখানা সচল রাখা, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।’
মজিবুর রহমান আরও বলেন, শিল্পকারখানাগুলো সচল থাকলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং গাজীপুরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। এ জন্য শিল্প মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিল্প খাতকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


