পাতায়ার অন্ধকারে মানুষের মুখ

পাতায়ার অন্ধকারে মানুষের মুখ
ছবি: লেখক থেকে সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ব্যাংককে পৌঁছে বিমানবন্দর থেকে সোজা পাতায়া। হোটেলে জিনিসপত্র রেখে সবাই নেমে গেলাম সুইমিংপুলে। সাঁতার শেষে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। হালকা কিছু খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম, পাতায়া শুধু সমুদ্রের শহর নয়, এটি রাতেরও শহর।

আলো ঝলমলে শহরের অন্ধকার মানুষ

পাতায়া আজ ঝকঝকে এক শহর। অথচ একদিন এখানে ছিল শুধু সমুদ্র, কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা আর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু কুঁড়েঘর। থাইল্যান্ড উপসাগরের এই ছোট্ট জেলেপল্লীকে তখন কেউ চিনত না।

১৯৫৯ সালের ২৯ জুন নাখন রাচাসিমার সামরিক ঘাঁটিতে থাকা প্রায় পাঁচশ মার্কিন সেনা এক সপ্তাহের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য পাতায়ায় আসে। সৈকতের দক্ষিণ পাশে স্থানীয়দের কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তারা সময় কাটায়। সেই থেকেই যেন পাতায়ার ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। একসময়ের জেলেপল্লীতে বাড়তে থাকে বিদেশিদের আনাগোনা। তারপর পর্যটন, ব্যবসা আর উন্নয়নের হাত ধরে পাতায়া একদিন দাঁড়িয়ে যায় পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত পর্যটন নগরী হিসেবে।

রাস্তার দুই পাশে নাইট ক্লাব, বার, রেস্টুরেন্ট, ম্যাসাজ পার্লার। আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। কোথাও গান, কোথাও মানুষের ভিড়, কোথাও আবার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী।

তাদের সাজে চোখ আটকে যায়। ঝলমলে পোশাক, চোখে মাসকারা, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। পথচারীদের ডাকছে। কেউ ম্যাসাজের কথা বলছে, কেউ শুধু হাসছে। একটু হাঁটলেই এমন মুখের দেখা মেলে।

কিন্তু সেদিন আমার চোখ শুধু তাদের সাজ দেখছিল না। আমি মানুষগুলোকে দেখতে চেয়েছিলাম।

আমি সাধারণত মানুষকে তার পেশা দিয়ে বিচার করতে চাই না। তাই ‘পতিতা’ শব্দটির বদলে আমি তাদের আনন্দকর্মী কিংবা বিনোদনকর্মী বলতে স্বস্তি বোধ করি। কারণ একটি পেশা কখনো একটি মানুষের পুরো পরিচয় হতে পারে না। প্রত্যেক মানুষেরই একটি গল্প আছে। সেই গল্পের কোথাও হয়তো কান্না আছে, কোথাও অভাব, কোথাও প্রতারণা, কোথাও বেঁচে থাকার অসম লড়াই।

সেদিন আমার ইচ্ছে হলো, এমন একজন মানুষের গল্প শুনব।

প্রথমদিকে একটু সংকোচ হচ্ছিল। এই ধরনের জায়গার সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতায় ঘৃণা, ভয় আর অস্বস্তি মিশে থাকে। নারীদের সঙ্গেও আমার জীবনভর খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল না। হাতে গোনা কয়েকজন নারী বন্ধু ছিল আমার। নারী সম্পর্কে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এসেছে আমার মায়ের কাছ থেকে।

তবু সেদিন সাহস করে মানুষের কাছে যেতে চাইলাম।

পাতায়ার সমুদ্রপাড়ে অনেক আনন্দকর্মীকে দেখলাম। তাদের মধ্যেই একজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম। নাম তার মিনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথা থেকে এসেছ? পরিবারে কে কে আছে? কতদূর পড়াশোনা করেছ?

সে আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না। বরং উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করল
তুমি কোন দেশের?
বললাম, বাংলাদেশ।
সে অবাক হয়ে বলল, বাংলাদেশ চিনি না। তুমি কি ইন্ডিয়ান?
তারপর আবার প্রশ্ন, শুধু ঘুরতে এসেছ, নাকি অন্য কোনো কাজ আছে?
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর যেতেই সে আমাকে থামাল।
বলল, আমার সঙ্গে সময় কাটাবে?
এক রাতের জন্য চার হাজার বাথ। আমি চলে এলাম।

কিন্তু মানুষটা মাথা থেকে গেল না। হোটেলে ফিরে পুলের পাশে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটার জীবনটা কেমন? পুলের স্বচ্ছ পানিতে তখন যেন পাতায়ার আলো নয়, কিছু মানুষের মুখ ভেসে উঠছিল।

আমাদের দেশের রহিমা, সখিনা, আমেনার মুখ। ঝড়ে ঘর হারানো কোনো নারী, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো কোনো মেয়ে, স্বামী পরিত্যক্তা কেউ কিংবা পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে নিজের জীবনটাকে বিসর্জন দেওয়া কেউ। মিনির মধ্যেও আমি তাদেরই মুখ দেখতে পেলাম।
রাত প্রায় বারোটা। কাউকে কিছু না বলে আবার সমুদ্রপাড়ে গেলাম। মিনিকে খুঁজতে। পেয়েও গেলাম।

সবচেয়ে অবাক হলাম, সে আমাকে চিনতে পেরেছে।
সেদিন তার সাজ ছিল অন্যরকম। আমাকে দেখেই বলল, সময় কাটাবে?
আমি মাথা নাড়লাম।
সে বলল, দুই হাজার বাথ।
রাত অনেক হয়ে গেছে। তাই হয়তো দাম কিছুটা কমিয়েছে।
আমি বললাম, এক হাজার।
সে বলল, না, পনেরোশ।
আমি রাজি হলাম।
সে জানতে চাইল, হোটেল কোথায়?
বললাম, হোটেলে যাব না। সমুদ্রের পাড়ে বসব। সে অবাক হয়ে তাকাল।
এখানে কী করবে?
বললাম, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
সে একটু হাসল।
ও… আচ্ছা।

আরও পড়ুন

আমরা সমুদ্রের পাড়ে বসলাম। একটা পাটি, কিছু ফল আর কোমল পানীয় কিনলাম। তারপর শুরু হলো আমাদের পরিচয়।

মিনি খুব অল্প বয়সে নেপাল থেকে থাইল্যান্ডে এসেছে। সে ও তার বোন দুজনেই একই পেশায় কাজ করেন।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
তার মা ফোন করেছিলেন।
ফোনে কথা বলার সময় হঠাৎ দেখলাম তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কথা শেষ করে সে চোখ মুছে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
আমি খুব দুঃখিত।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
একজন মানুষ এত কষ্টের মধ্যেও এত বিনয়ী কী করে থাকে?

সেদিন আমার অনেক পুরোনো ধারণা ভাঙতে শুরু করল। আমরা যাদের একটা শব্দ দিয়ে বিচার করে ফেলি, তাদের ভেতরেও তো আমাদের মতোই ভালোবাসা আছে, অভিমান আছে, পরিবার আছে, দায়িত্ব আছে, স্বপ্ন আছে।

মিনি ইংরেজি খুব ভালো জানে না। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলছিল। বারবার জিজ্ঞেস করছিল, আমি হোটেলে যাব না?
আমি শুধু হাসছিলাম।
একসময় সে বলল, তোমাকে কিন্তু পুরো টাকাটাই দিতে হবে।
আমি আবার হাসলাম।
তারপর সে বলল, সকাল হয়ে যাচ্ছে, আমি বুঝেছি।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
তুমিই আমার জীবনের প্রথম মানুষ, যে শুধু গল্প করার জন্য আমাকে টাকা দিচ্ছে।
কথাটা বলেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেই দীর্ঘশ্বাসটা আজও আমার কানে বাজে।
আমাদের কথার মাঝে সে আমার কয়েকটা ছবি তুলে দিয়েছিল। আমি তার সঙ্গে একটা সেলফি তুলতে চেয়েছিলাম। সে রাজি হয়নি।

কেন জানি না। তবে সেদিন তার সঙ্গে কাটানো সময়ে একবারও মনে হয়নি, সে আমাদের সমাজের বাইরের কেউ। বরং উল্টোটা মনে হয়েছে। নিজেকেই অনেক ছোট মনে হয়েছে।

আমরা যারা নিজেদের ভদ্র, সভ্য আর সম্মানিত মানুষ বলে মনে করি, আমাদের ভেতরে কতটা নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকে! আর যে মেয়েটাকে সমাজ সহজেই ‘অপবিত্র’ বলে দূরে সরিয়ে দেয়, তার ভেতরে এত মায়া, এত বিনয় কীভাবে থাকে?

মিনির জীবনের গল্প খুব আলাদা নয়। তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। অসুস্থ মা, দুই ভাই। তাদের জন্য তাকে উপার্জন করতে হয়। কাজ না পেয়ে দুই বোন শেষ পর্যন্ত এই পেশায় আসে।

তার জীবনের শুরুটাও সুখের ছিল না। একসময় একজন প্রতিবেশীর লালসার শিকার হয়েছিল সে। পরে প্রতিশ্রুতি আর টাকার বিনিময়ে একের পর এক মানুষের কাছে ব্যবহৃত হয়েছে। একসময় হয়তো প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। একটা সময় সে জীবনকে মানিয়ে নিতে শিখেছিল।

তার বিয়ে হয়েছিল। একটি সন্তানও আছে। পরে নানা পরিস্থিতিতে আবার এই পেশায় ফিরে আসে। উন্নত জীবনের আশায় একসময় বোনকে নিয়ে সে পাতায়া চলে আসে।

এখানে জীবন সস্তা নয়। জিনিসপত্রের দাম বেশি, জীবনযাত্রার খরচ বেশি। আর মিনির আয় নির্ভর করে দূরদেশ থেকে আসা পর্যটকদের ওপর।

তারপরও সে লড়াই করে।

নিজের জন্য যতটা, তার চেয়েও বেশি পরিবারের জন্য।

সেদিন ভোরের দিকে সমুদ্রের পাশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, মিনি আর এই সমুদ্রের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল আছে। সমুদ্রের ওপর দিয়ে কত বাতাস যায়, কত ঢেউ আছড়ে পড়ে, কত মানুষ তার বুকে আনন্দ খোঁজে। সমুদ্র কিছু বলে না। মিনিও যেন তেমনই।

মানুষ তার কাছে আসে। কেউ আনন্দ নিয়ে ফিরে যায়, কেউ নিজের রাগ-অভিমান রেখে যায়। কেউ তাকে মানুষ হিসেবে দেখে আবার কেউ শুধু শরীর হিসেবে।

সে তবু চুপ থাকে। হয়তো বেঁচে থাকার জন্য কিছু মানুষকে সমুদ্রের মতো হতে হয়। সবকিছু সহ্য করতে হয়।

রাত শেষ হয়ে আসছিল। আর কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠবে।

হঠাৎ মনে হলো, এই সূর্যের আলো কি মিনিদের গায়েও সমানভাবে পড়ে? নাকি সমাজের কিছু মানুষের জন্য সূর্যের আলোও আলাদা?

রাতের পাতায়া তখনও ঝলমল করছে। কোথাও গান বাজছে, কোথাও আলো জ্বলছে, কোথাও মানুষের ভিড়। আর সমুদ্রের পাশে একজন মেয়ে বসে আছে।

তারও তো একটা সকাল আছে। তারও তো সূর্যের আলোয় দাঁড়ানোর অধিকার আছে।

সাগরপাড় দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছি। গন্তব্য হোটেল, কিন্তু মনটা যেন গন্তব্যহীন কোনো পথে হাঁটছে।

মনে হচ্ছে, এই শহরটা যেন সবার জন্যই নিরাপদ। একা একা হাঁটছি, অথচ কোথাও একটুও ভয় নেই। মাথার ওপর বিশাল এক খোলা আকাশ—মনে হচ্ছে, সেই আকাশটুকু যেন শুধুই আমার জন্য। কোনো দেয়াল নেই, কোনো শেকল নেই, কোনো অদৃশ্য ভয় নেই।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো, মিনিরা, সখিনারা যেন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে আমরাও কবে এমন একটি মুক্ত আকাশ পাব? কবে আমরা মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে পারব?
সত্যি বলতে, সেই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

জানি না, আর কতকাল অসাম্যের সামাজিক শৃঙ্খল মানুষকে বেঁধে রাখবে। জানি না, কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি। আর কতটা সময় পেরোলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য নিশ্চিত হবে একমুঠো খাবার, একটু নিরাপদ আশ্রয়, মাথা গোঁজার মতো একটুকরো জায়গা? এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ, মানুষ হিসেবেই বাঁচতে পারবে। তবে বিশ্বাস করি এই পৃথিবী একদিন মানুষের পৃথিবী হবে। মানবতার জয়ের ধনী সর্বত্র ধ্বনিত হবে। মানুষকে পণ্য নয় মানুষ হিসেবেই দেখা হবে।

সকাল হয়ে এলো, আমি আর মিনি গন্তব্যের পথে এগিয়ে চললাম। সকালের নরম আলোয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল মিনিদের গল্প, তবু তাদের কথা রয়ে গেল মনের ভেতর, নীরব এক অনুভূতি হয়ে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad