সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজ, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক নানা জনশ্রুতিকে ঘিরে মন্দিরটি এখন জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের হাটিকুমরুল বাসস্টেশন থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে একটি রাস্তা। ধানক্ষেতের বুক চিড়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই চোখে পড়ে পোড়ামাটির কাব্যে গাঁথা এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। একসময় বর্ষাকালে মেঠোপথটি কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও বর্তমানে মন্দিরে যাতায়াতের রাস্তা সংস্কার করে পাকা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি ‘দোলমঞ্চ’ বা ‘দোলমন্দির’ নামেও পরিচিত। কথিত আছে, মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে রামনাথ ভাদুরী নামের এক ব্যক্তি মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তবে নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে এবং মন্দিরের নির্মাণ-সংক্রান্ত কোনো শিলালিপি বা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠালিপি পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে এটি ভাদুরী জমিদার পরিবারের মন্দির হিসেবেও পরিচিত।
তিনতলা বিশিষ্ট মন্দিরটি নবরত্ন স্থাপত্য পরিকল্পনায় নির্মিত। একসময় মন্দিরের ওপর নয়টি চূড়া বা ‘রত্ন’ ছিল। এ কারণে এর নাম হয় নবরত্ন মন্দির। বর্তমানে এসব চূড়ার অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে।
উঁচু বেদির ওপর নির্মিত বর্গাকার মন্দিরটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ দশমিক ৪ মিটার। নিচতলায় দুটি বারান্দা দিয়ে ঘেরা রয়েছে মূল গর্ভগৃহ। বারান্দার বাইরের দিকে সাতটি এবং ভেতরের দিকে পাঁচটি খিলান বা প্রবেশপথ রয়েছে। গর্ভগৃহে পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় কোনো বারান্দা নেই। মূল ভবনের ওপরের ছাদ ভেতর থেকে গোলাকার গম্বুজের মতো দেখা যায়।
মন্দিরের বাইরের দেয়ালজুড়ে একসময় ছিল অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক। এসব ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ফুল, ফল, লতাপাতা, বিভিন্ন নকশা এবং দেব-দেবীর নানা চিত্র। কালের বিবর্তন, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় অধিকাংশ অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেলেও এখনো দেয়ালের গায়ে পুরোনো পোড়ামাটির কারুকাজের কিছু চিহ্ন দেখা যায়।
স্থাপত্যশৈলীতে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজীর মন্দিরের সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রামনাথ ভাদুরী কান্তজীর মন্দিরের আদলে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
নবরত্ন মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। মন্দিরের আশপাশে কয়েক ফুট মাটি খুঁড়লেই পুরোনো ইটের দেয়াল ও স্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ধারণা, একসময় এখানে ভাদুরী জমিদারদের বড় একটি বাড়ি বা স্থাপনা ছিল, যা কালের বিবর্তনে মাটির নিচে হারিয়ে গেছে।
মন্দিরের পাশের পুকুরটিকে ঘিরেও রয়েছে নানা গল্প। কেউ মনে করেন, পুকুরে দেব-দেবীর ‘আস্তানা’ রয়েছে; আবার কারও ধারণা, জমিদারদের গুপ্তধন সেখানে লুকানো থাকতে পারে। তবে এসবের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: কান্তজীউ মন্দিরের অপূর্ব শৈলী
নবরত্ন মন্দিরের আশপাশে আরও কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিব-পার্বতী মন্দির, দোচালা আকৃতির চণ্ডী মন্দির এবং পুকুরের পশ্চিম পাড়ের আরেকটি শিব মন্দির। পুরো এলাকাটি প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
দীর্ঘদিন ঝোপঝাড় ও অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকা মন্দিরটি পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আসে। বর্তমানে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দির ও আশপাশের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।
মন্দিরের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা মহাব্বত বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে আমি এই মন্দিরের দায়িত্বে আছি। প্রতিদিন সকালে এসে প্রথমে মন্দির ও আশপাশের জায়গা পরিষ্কার করি। এরপর দর্শনার্থীদের জন্য মন্দির খুলে দেওয়া হয়। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এবং গরমকালে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য এটি খোলা থাকে।’
বগুড়া থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সুমি বলেন, ‘আগে বই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরের কথা শুনেছি। এবার সরাসরি এসে দেখে খুব ভালো লাগছে। এত পুরোনো একটি স্থাপনা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। তবে মন্দিরের ইতিহাস ও স্থাপত্য সম্পর্কে আরও তথ্য দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় হবে।’
তার বান্ধবী প্রিয়া বলেন, ‘এখানে এসে মনে হচ্ছে ইতিহাসের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছি। মন্দিরের পোড়ামাটির কাজ ও পুরোনো স্থাপত্য খুব সুন্দর। জায়গাটি আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার করা হলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসবে।’
বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, মন্দিরের চারপাশের জায়গাগুলো দখলমুক্ত করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে দর্শনার্থী এবং হিন্দু ভক্তদের সুবিধার পাশাপাশি মন্দিরটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ১৯৮৬ সালের সিএস রেকর্ডে মন্দিরটি ‘দোল মন্দির’ নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। দোল উৎসবের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাচীন এই স্থাপনাটি শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনের দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক।
উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে আগত বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে সার্বিক সহযোগিতা করা হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই মন্দিরটিকে দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে দেশে-বিদেশে প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ধানক্ষেত, সবুজ প্রকৃতি, প্রাচীন পুকুর আর পোড়ামাটির কারুকাজে ঘেরা হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরের পরিবেশ বেশ ছিমছাম ও নান্দনিক। ইতিহাস ও স্থাপত্যের পাশাপাশি গ্রামীণ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও এখানে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
প্রাচীন এই স্থাপনাটি শুধু একটি মন্দির নয়, এটি বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্য, পোড়ামাটির শিল্প এবং হারিয়ে যাওয়া জমিদারি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা, তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড, পর্যটনসুবিধা ও ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।


