যে বেকারিতে কখনো প্রিন্স অব ওয়েলস আসেননি!

যে বেকারিতে কখনো প্রিন্স অব ওয়েলস আসেননি!
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

পুরান ঢাকা যেন এক বিস্ময়ের ভাণ্ডার। কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা আর বিশেষ কিছু খাবারের কথা নতুন করে বলার নেই। আবার এই পুরান ঢাকাতেই এমন অনেক দোকান ও সেবাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।

রিকশায় চড়ে লক্ষ্মীবাজারের অলিগলি ঘুরে আমরা এমন একটি দোকান খুঁজছিলাম, যেটিকে ঢাকার প্রথম দিককার বেকারিগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।

কেউ কেউ দাবি করেন, এটিই ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো বেকারি। তবে দাবিটি নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট নথি আমাদের হাতে নেই।

তবে এটুকু নিশ্চিত, লক্ষ্মীবাজারে সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ঠিক পাশের প্রিন্স অফ ওয়েলস বেকারি প্রায় ১৫০ বছর ধরে টিকে আছে।

বেকারির কর্মীরা অবশ্য বললেন, এর বয়স আসলে ১৬৫ বছর। তবে আপাতত ১৫০ বছরেই স্থির থাকা যাক।

প্রিন্স অফ ওয়েলস বেকারির বিশেষত্ব কী?

অবশ্যই এর নাম। আর এর লোগোটি যে মুকুট, তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে বেগ পেতে হচ্ছে না।

কয়েক দশকে আরও ঝলমলে অনেক মিষ্টান্ন ও বেকারির দোকান গড়ে ওঠায় প্রিন্স অফ ওয়েলস বেকারির খ্যাতি কিছুটা ম্লান হয়েছে।

‘তারপরও বিস্কুট, পেস্ট্রি ও বিখ্যাত বাটার কেক কিনতে এখনো সোজা এখানেই আসি। গত শতকের গোড়ার দিকে চালু হওয়ার পর থেকে একই রেসিপিতে এখনো তৈরি হয় সেই বাটার কেক,’ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা ও সেন্ট গ্রেগরিজের সাবেক ছাত্র আকবর আলী।

বেকারিটিতে চোখধাঁধানো আলোর ব্যবস্থা নেই। নামটি ছাড়া বাহ্যিকভাবে আকর্ষণ করার মতো তেমন কিছুই নেই। তবে সাজসজ্জার সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেন এখানে কর্মরতরা, তাদের আন্তরিক আতিথেয়তায়।

আরও পড়ুন

আমরা যাওয়ার পর তাঁরা গরম চায়ের সঙ্গে বিখ্যাত বাটার কেক খেতে দিলেন। সত্যিই দারুণ এক আপ্যায়ন! এরপরই ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে শুরু করল বেকারিটির গল্প।

পেস্ট্রি শেফ মুসলিম মিয়া বলেন, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ওয়েলসের এক ব্যক্তি বেকারিটি চালু করেছিলেন। মুসলিম মিয়া সত্তরের দশকের গোড়া থেকে লক্ষ্মীবাজারে বসবাস করছেন।

তিনি জানান, পরে সেই ব্যক্তি এখানে কর্মরত এক বাঙালির কাছে দোকানটি বিক্রি করে দেন। এর পর থেকে একই পরিবার বেকারিটি পরিচালনা করে আসছে।

রাস্তার ঠিক উল্টো পাশে ঝলমলে আলো আর উচ্চ শব্দে গান বাজানো আধুনিক একটি ফাস্ট ফুড ও পেস্ট্রির দোকানকে দেখতে হয়তো বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। তবে মুসলিম মিয়া শান্তভাবে হেসে বললেন, ‘শীত এলে খ্রিষ্টানদের বিয়ে, নববর্ষের পার্টি ও স্থানীয় গির্জার নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়। তখন অর্ডারগুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছেই আসে।’

নরম স্বভাবের দাঁড়িওয়ালা মুসলিম মিয়া ‘আমাদের’ শব্দটির ওপর যেন একটু বেশি জোর দিলেন। তিনি বলেন, ‘বিয়ের জন্য আমি ২০০ থেকে ৪০০ পাউন্ড ওজনের চারতলা কেক তৈরি করেছি।’

‘সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত একটি বাংলাদেশি খ্রিষ্টান পরিবার, যাদের একটি খ্যাতনামা ব্যবসায়িক শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে, তারা প্রায়ই করপোরেট অনুষ্ঠানের জন্য বড় অর্ডার দেয়’ বলেন তিনি।

তার ভাষায়, দোকানে রেডিমেড রাখা খাবারগুলোর মান সাধারণ মনে হতে পারে। তবে কোনো অনুষ্ঠানের বড় অর্ডারের খাবার তৈরি সর্বোচ্চ যত্নে নিয়ে করা হয়।

মুসলিম মিয়া বলেন, ‘কিছুদিন আগেই আমরা ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দূতাবাসে ১০০টি কাপ চিজকেক দিয়েছি।’ এমন তথ্য দেওয়ার সময় তার হাসিতে থাকা গর্বের ছাপ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে তা চোখ এড়ায় ছিল না।

দোকানের ব্যবস্থাপক আমাকে ডিসেম্বরে আবার আসতে বললেন। তখনই নাকি এ বেকারির আসল ব্যস্ততা দেখা যাবে।

তিনি বলেন, ‘বিয়ের কেকের অর্ডার তখন অনেক থাকে। গ্রাহক যদি সেরাটা চান, তাহলে আমরা বেকারির নামের মর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টা করি।’

অর্ডার অনুযায়ী বিশেষভাবে তৈরি বেকারিটির লাল ও নীল বাক্সগুলো দেখতে দেখতে মনে হলো, ব্রিটিশ রাজপরিবারকে পণ্য সরবরাহকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই বেকারির সম্পর্ক না থাকলেও ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’ নামটি ঐতিহ্য ও মানের একধরনের নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করে।

ব্রিটেনে রাজপরিবারে পণ্য সরবরাহকারী যেকোনো দোকানের ‘রয়্যাল ওয়ারেন্ট’ বা রাজকীয় স্বীকৃতি থাকে। লবণ, ভিনেগার, মদ, মাখন থেকে শুরু করে বোতাম পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যই এই স্বীকৃতির আওতায় পড়ে।

ব্রিটেন থেকে বহু দূরে, একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এমন একটি দেশে প্রিন্স অফ ওয়েলস বেকারির নামটিও যেন সত্যিকারের রাজকীয় স্বীকৃতির মতো একই মর্যাদা বহন করে।

বড় একটি মুকুট আঁকা বিখ্যাত লাল বাক্সে করে কিছু কিনে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার লোভ আপনি সামলাতে পারবেন না—বাজি ধরে বলা যায়।

কারণ, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনকে আমরা যতই নিন্দা করি না কেন, রাজকীয়তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আকর্ষণ ও জৌলুশ আমাদের মুগ্ধ করতে কখনো ব্যর্থ হয় না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad