শরতের পূর্ণিমার চাঁদ। গ্রামের উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন দর্শক-শ্রোতা। সামনে জলচৌকিতে পাঠক। হারিকেন ও কুপির আলোয় তৈরি হয়েছে মায়াময় পরিবেশ। নিস্তব্ধ রাত ভেঙে ভেসে আসছে পুঁথি পাঠের সুর।
কয়েক দশক পর এমন আয়োজন দেখা গেল পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামে।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে বসে এই পুঁথি পাঠের আসর।
চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে চলনবিলের পাড়ে সোনাহারপাড়া। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, উঠোনে পুঁথি পাঠের প্রস্তুতি চলছে। এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে দর্শকদের বসার আয়োজন। ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে এরই মধ্যে জড়ো হয়েছেন অনেকে।
রাত সোয়া ৯টায় শুরু হয় আসর। চলে সোয়া ১০টা পর্যন্ত। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা মাদুরে বসে পুঁথি পাঠ শোনেন। চাটমোহরের পাশাপাশি ঢাকা থেকেও সংস্কৃতিপ্রেমীরা আসেন।
বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় আয়োজক আতিকুর রহমান আতিক মুখবন্ধ পাঠ করেন। এরপর ‘বিবি সোনাভান’ পুঁথি পাঠ করেন নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। পরে দুজনকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়।
পুঁথি পাঠের সুরে মুগ্ধ হন দর্শক-শ্রোতারা। অনেকের মনে পড়ে যায় শৈশবে দাদা-দাদির মুখে শোনা গল্পের আসর।
সত্তরোর্ধ্ব কৃষক হাসান প্রামাণিক বলেন, ‘৪০ বছর আগে পুঁথি পাঠ শুনেছিলাম। তখন মুরুব্বিরা আয়োজন করতেন। কৃষিকাজের অবসরে আসরে বসে পুঁথি শুনতাম। এত বছর পর আবার আয়োজনটি দেখে ভালো লাগছে।’
অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, ‘ছোটবেলায় নানা বাড়িতে বৈঠকখানায় এমন আসর বসত। এত বছর পর পুঁথি পাঠ শুনে সেই সময়ে ফিরে গিয়েছিলাম। এখন আমরা মোবাইলে ডুবে আছি। দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখা দরকার।’
তরুণ ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘পুঁথি পাঠ কী, তা জানতাম না। ফেসবুকে আয়োজনের খবর দেখে আতিকের কাছে জানতে পারি। আগে কখনো দেখিনি। তাই আব্বুর সঙ্গে দেখতে এসে খুব ভালো লাগছে।’
চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন, ‘প্রযুক্তির এই সময়ে পুঁথি পাঠের আয়োজন বিরল। শত শত বছরের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। পুঁথি পাঠ আমাদের আদি সংস্কৃতির অংশ। এটি ধরে রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার।’
প্রথমবার পুঁথি পাঠ করা নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল বলেন, ‘গ্রামে পুঁথি পাঠ শোনার সময় থেকেই এর সুর আমার মধ্যে ছিল। আজ প্রথম পাঠ করলাম। মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরি করতে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য ধরে রাখা দরকার। সমসাময়িক গল্পে পুঁথি লেখা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।’
আয়োজক আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘পুঁথি পাঠ আমাদের সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির অংশ। ষোড়শ-সপ্তদশ শতক থেকে আশি-নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এটি টিকে ছিল। এখন প্রায় বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্মকে হারিয়ে যাওয়া এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করাতেই আয়োজনটি করা হয়েছে।’
ঢাকা থেকে আসা পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ বলেন, ‘খুব ভালো আয়োজন। পুঁথি পাঠ জনপ্রিয় করতে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন গল্প তৈরি করতে হবে। এতে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। এই ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, সার্কাস, পুঁথি পাঠ ও হাটুরে কবিতা একসময় গ্রামীণ জীবনের অংশ ছিল। আধুনিকতার প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও ভিন্ন সংস্কৃতির চর্চায় এসব লোকজ ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। এগুলো ধরে রাখতে সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


