একসময় এই সুতোয় বোনা হতো ভবিষ্যতের গল্প। আজ সেই একই সুতো হয়ে উঠেছে টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের কয়েকটি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প টিকিয়ে রাখতে লড়াই করে যাচ্ছে।

একসময় গ্রামীণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁতশিল্প। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কারখানায় তৈরি কাপড়ের দাপটে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও কিছু পরিবার এখনো এই প্রাচীন পেশাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। রঙিন সুতো দিয়ে তারা গামছা, লুঙ্গি, কম্বল, মাদুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য নিজ হাতে তৈরি করছে।
যে শব্দ একসময় গ্রামীণ বাংলার জীবনের স্পন্দন ছিল, তাঁতের সেই ছন্দময় খটখট শব্দ তাদের উঠানে এখনো শোনা যায়। কিন্তু বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তাদের কাছে প্রতিটি সুতো শুধু একটি পণ্যের অংশ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্মের অর্জিত জ্ঞান এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে টিকিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রাম।

তাঁতিরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেও খুব সামান্য পারিশ্রমিক পান। তাদের কারখানায় তৈরি সস্তা ও দ্রুত উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে নিত্য প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে । তবুও তারা থেমে নেই। শুধু লাভের আশায় নয়, বরং ঐতিহ্য ও গর্ব থেকেই তারা এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

তাদের হাত এমন কিছু জানে, যা যন্ত্র সহজে অনুকরণ করতে পারে না। তাদের আছে–শৈশব থেকে শেখা কারুশিল্পের ধৈর্য, বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের হাতে পৌঁছে যাওয়া তাঁতের ছন্দ এবং নিজের হাতে কিছু তৈরি করার নীরব গৌরব।

মোহনপুরে তাঁতশিল্প টিকিয়ে রাখার এই লড়াই শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষারও লড়াই। আর যতদিন তাঁতগুলো চলতে থাকবে, ততদিন গ্রামীণ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি অংশ বেঁচে থাকবে।


