ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এতে বলা হয়েছে, গাজায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কর্মক্ষম ফিলিস্তিনিদের ৯০ শতাংশেরই বর্তমানে কোনো কাজ নেই, যার ফলে এখানকার মানুষ জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়েছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি) থেকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬৭ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার কারণে এখানকার অর্থনীতি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলি অভিযানের মুখে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

প্রতিবেদনে গাজার অর্থনীতির বর্তমান কঙ্কালসার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, গাজায় কর্মক্ষম মানুষের ৯০ শতাংশই বেকার। ২০২৫ সালে এসে একজন ফিলিস্তিনির বার্ষিক গড় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১২ ডলার, অর্থাৎ দিনে মাত্র ৫৮ সেন্ট। ২০২২ সালের তুলনায় এই উৎপাদন ক্ষমতা ৮২ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ২৭৪ শতাংশ।

কৃষি ও শিল্পের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। গাজার চাষযোগ্য জমির মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে এবং সামগ্রিক শিল্প ও কৃষি উৎপাদন ৯৪ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ ব্যবসা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পেদ্রো ম্যানুয়েল মোরেনো বলেন, ‘গাজার অর্থনীতির এই পতন বিশ্বে দেখা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট।’
প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেনেভায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সতর্ক করেন, ‘এই পরিস্থিতি গাজার কয়েক দশকের উন্নয়ন ধ্বংস করেছে এবং এখানকার মানুষের বেঁচে থাকাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।’

এই অর্থনৈতিক সংকট গাজা ছাড়িয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বসতি ক্রমাগত বাড়ার কারণে সেখানে ফিলিস্তিনিদের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইসরায়েল ‘ফিলিস্তিন সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আটকে রেখে তাদের চরম আর্থিক সংকটে ফেলছে’ বলে অভিযোগ করা হয়। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রাজস্ব না পাওয়ায় ফিলিস্তিনি প্রশাসনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই সংকট দ্রুত ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

ইউএনসিটিএডির ফিলিস্তিন সহায়তা সমন্বয়ক মুতাসিম এলাগ্রা এএফপিকে বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে গাজার প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজন দরিদ্র ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ‘গাজার সব মানুষ নানা দিক থেকে দারিদ্র্যের শিকার’। শিল্প ও কৃষি উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিরা এখন পুরোপুরি মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

এই অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের জন্য ইসরায়েলকে সরাসরি দায়ী করেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এমন সব কৃত্রিম বাধা তৈরি করেছে, যা ফিলিস্তিনি অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশ রুখে দিয়েছে এবং মানুষকে পুরোপুরি অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন (৭ হাজার ১৫০ কোটি) মার্কিন ডলার প্রয়োজন। শুধু যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ সরাতেই কয়েক দশক সময় লাগতে পারে, যদিও উপযুক্ত পরিস্থিতি পাওয়া গেলে সাত বছরের মধ্যে এই ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ইতোমধ্যে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দ্রুত বড় পরিসরে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া। এমনভাবে ফিলিস্তিনের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে শুধু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং দখলদারত্বের কারণে কয়েক দশক ধরে যে উন্নয়ন থেমে আছে, সেটিও ফিরিয়ে আনা যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলোতে যে কার্যকর, সার্বভৌম ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে, তা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য জরুরি। তবে ভেঙে পড়া অর্থনীতির ওপর এমন রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।


